রাজনীতির উত্তাল রাজপথে যারা স্বজন হারিয়েছেন, সেই শোকাতুর পরিবারগুলোর প্রতি সংহতি প্রকাশ করে বিশেষ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিএনপি। দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানিয়েছেন, জনগণের সমর্থনে আগামীতে বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে গুম ও খুনের শিকার পরিবারগুলোকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। তাদের পুনর্বাসন ও সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় কাজ করবে দলটি।
শনিবার (১৭ জানুয়ারি) রাজধানীর চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে এক আবেগঘন পরিবেশে এই মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। ‘আমরা বিএনপি পরিবার’ ও ‘মায়ের ডাক’ নামক সংগঠনের উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে গুম ও রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের শিকার পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। দীর্ঘদিনের জমানো ক্ষোভ আর কান্নায় এক ভারী পরিবেশের সৃষ্টি হয় অনুষ্ঠানস্থলে।
রিজভী তার বক্তব্যে জোর দিয়ে বলেন, গুম হওয়া সন্তানদের বাবা-মায়ের যে ত্যাগ এবং রাজপথে ঝরে যাওয়া রক্তের যে স্মৃতি, তার কোনো আর্থিক বা জাগতিক প্রতিদান দেওয়া সম্ভব নয়। তবে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বারবার অঙ্গীকার করেছেন যে, এই পরিবারগুলোকে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে যথাযথ মূল্যায়ন করা হবে। জনগণের সরকার ক্ষমতায় এলে সেই প্রতিশ্রুতি অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হবে।
দলের এই মুখপাত্রের মতে, হারিয়ে যাওয়া স্বজনদের রক্তাক্ত লাশের স্মৃতিকে উপেক্ষা করে কোনো রাজনৈতিক সাফল্যই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। বরং এই আত্মত্যাগই হবে দেশে সত্যিকারের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মূল ভিত্তি। তিনি উল্লেখ করেন, জাতি এখন এক গভীর রক্তঋণে আবদ্ধ এবং সেই ঋণ পরিশোধ করা প্রতিটি গণতান্ত্রিক কর্মীর নৈতিক দায়িত্ব।
প্রয়াত নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কথা স্মরণ করে রিজভী বলেন, ৪৪ বছর ধরে যাকে কোনো শক্তি দমন করতে পারেনি, যার মাথা কখনো অন্যায়ের কাছে নত হয়নি, সেই নেত্রী আজ আমাদের মাঝে নেই। তবে তার সেই আদর্শের পতাকা এখন তারেক রহমানের হাতে। সেই পতাকা যেন কখনো নুয়ে না পড়ে, সেজন্য শহীদ ও গুম হওয়া পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো এবং ঐক্যবদ্ধ থাকা জরুরি।
মতবিনিময় সভায় ভুক্তভোগী পরিবারের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নিখোঁজ বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর লুনা এবং হুম্মাম কাদের চৌধুরী। নিজ নিজ পরিবারের কষ্টের কথা বলতে গিয়ে তারা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। বছরের পর বছর ধরে স্বজনদের ফেরার প্রতীক্ষায় থাকা এই মানুষগুলোর চোখে ছিল কেবল বিচার আর সত্য জানার আকুতি।
অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন আহমেদসহ দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা অংশ নেন। ‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর আহ্বায়ক আতিকুর রহমান রুমন সভায় সভাপতিত্ব করেন। নেতারা বলেন, কেবল রাজনৈতিক সভা নয়, এটি ছিল দীর্ঘদিনের বঞ্চনার শিকার মানুষের হৃদয়ের আর্তনাদ শোনার একটি মঞ্চ।
বক্তারা অভিযোগ করেন, গত দেড় দশকে অসংখ্য নেতাকর্মীকে গুম ও খুন করা হয়েছে, যার বিচার বিভাগীয় তদন্ত হওয়া সময়ের দাবি। বিএনপি এই পরিবারগুলোর পাশে শুধুমাত্র রাজনৈতিক কারণে নয়, বরং মানবিক দায়বদ্ধতা থেকে দাঁড়িয়েছে বলে তারা দাবি করেন। আগামী দিনে আন্দোলনের প্রতিটি ধাপে এই পরিবারগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং তাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে বিশেষ তহবিল গঠনের ইঙ্গিতও দেন তারা।
সভা শেষে রুহুল কবির রিজভী পুনরায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছে, তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আসতেই হবে। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে গুম হওয়া সন্তানদের রক্ত বৃথা যেতে দেওয়া হবে না।

