বুলাওয়ের সবুজ ঘাসে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের হাইভোল্টেজ ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশ বাংলাদেশ ও ভারত। মাঠের লড়াই শুরুর আগেই এক অনাকাঙ্ক্ষিত ও নজিরবিহীন দৃশ্য দেখল ক্রিকেট বিশ্ব। টস পর্ব শেষ হওয়ার পর প্রথা অনুযায়ী দুই দলের অধিনায়ক একে অপরের সঙ্গে হাত মেলানোর কথা থাকলেও, এদিন তার ব্যতিক্রম ঘটেছে। দুই দেশের প্রতিনিধিদের এই শীতল আচরণ মাঠের বাইরের উত্তপ্ত পরিস্থিতিরই প্রতিফলন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
শনিবার জিম্বাবুয়ের বুলাওয়েতে টস করতে নামেন বাংলাদেশের সহ-অধিনায়ক জাওয়াদ আবরার এবং ভারতের অধিনায়ক আয়ূশ মাত্রে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ দলের নিয়মিত অধিনায়ক আজিজুল হাকিম তামিম হলেও টস পর্বে দায়িত্ব সামলান জাওয়াদ। টসের কয়েন ভাগ্য জাওয়াদের পক্ষেই যায় এবং তিনি ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন। তবে এরপরই ঘটে সেই অদ্ভুত ঘটনা; একে অপরের খুব কাছে দাঁড়িয়ে থাকলেও হাত মেলাননি দুই যুবা প্রতিনিধি।
আইসিসির প্রতিটি টুর্নামেন্ট বা আন্তর্জাতিক ম্যাচে টসের পর সৌজন্যমূলকভাবে হাত মেলানো একটি দীর্ঘদিনের রীতি। খেলার স্পিরিট বা ভ্রাতৃত্ব বজায় রাখতে এটি বাধ্যতামূলক না হলেও অলিখিত নিয়ম হিসেবেই বিবেচিত। তবে বুলাওয়েতে আজ সেই সৌজন্যের লেশমাত্র দেখা যায়নি। আইসিসির অফিসিয়াল ইভেন্টে দুই প্রতিবেশী দেশের প্রতিনিধিদের এমন অনীহা মুহূর্তের মধ্যেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে।
কেন এমন আচরণ? যদিও এর কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ এখন পর্যন্ত বোর্ড বা খেলোয়াড়দের পক্ষ থেকে জানানো হয়নি, তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনই এর মূল কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। ক্রিকেট ও রাজনীতি যে একে অপরের সঙ্গে সমান্তরালে চলছে, এই ঘটনা তার এক জলজ্যান্ত প্রমাণ।
দুই দেশের ক্রিকেটীয় সম্পর্কের অবনতি শুরু হয়েছে বেশ কিছু ঘটনাকে কেন্দ্র করে। সম্প্রতি ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) থেকে বাংলাদেশের অভিজ্ঞ পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে বিসিসিআই বাদ দেওয়ার পর থেকেই জনমনে অসন্তোষ দানা বাঁধে। এর পর নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে ভারতে অনুষ্ঠিতব্য টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে দল পাঠাতে অস্বীকৃতি জানায় বাংলাদেশ। পাল্টাপাল্টি হিসেবে বাংলাদেশের ভিসা পাননি আইসিসির একজন ভারতীয় কর্মকর্তা।
এই শীতল যুদ্ধের প্রভাব যে কেবল বড়দের বা সিনিয়র পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই, তা আজ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের মঞ্চে পরিষ্কার হয়ে গেল। এর আগে গত বছরের এশিয়া কাপেও ভারত ও পাকিস্তানের ক্রিকেটারদের মধ্যে একই ধরনের দৃশ্য দেখা গিয়েছিল। দুই দেশের রাজনৈতিক সংকটের কারণে ক্রিকেটাররা টস কিংবা ম্যাচের পর হাত মেলানো থেকে বিরত ছিলেন। এমনকি পাকিস্তানের মহসিন নাকভির হাত থেকে ভারত শিরোপা গ্রহণ না করার মতো ঘটনাও বিশ্ব ক্রিকেটকে হতবাক করেছিল।
ক্রিকেট মাঠে যখন বল আর ব্যাটের লড়াই হওয়ার কথা, তখন সেখানে রাজনীতির এই ছায়া প্রভাব ফেলছে কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তবে টসের পর জাওয়াদ আবরার এসব নিয়ে কোনো মন্তব্য না করে কেবল ম্যাচ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেন। তিনি জানান, উইকেট কিছুটা ভেজা থাকায় প্রথম ১০-১৫ ওভারের সুবিধা নিতেই তারা বোলিং বেছে নিয়েছেন।
বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসি এই বিষয়টিকে কীভাবে দেখবে, তা নিয়ে এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে মাঠের খেলায় বাংলাদেশ ও ভারত দুই দলই যখন জয়ের নেশায় লড়ছে, তখন গ্যালারি এবং ড্রেসিংরুমের বাইরের এই শীতল আবহাওয়া টুর্নামেন্টের উত্তেজনাকে ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে গেল। এখন দেখার বিষয়, ম্যাচ শেষে খেলোয়াড়রা সেই সৌজন্য বজায় রাখেন কি না।
রাজনৈতিক এই বিভেদ যদি খেলার মাঠেও এমন দূরত্ব তৈরি করে, তবে তা ক্রিকেটের মূল সৌন্দর্য ‘জেন্টলম্যানস গেম’ তকমাকে ম্লান করে দিতে পারে বলে ক্রিকেট প্রেমীদের আশঙ্কা। আপাতত বুলাওয়ের মাঠে বল গড়ালেও সবার নজর মাঠের বাইরের এই অস্থির সম্পর্কের দিকে।

