বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার গুরুতর অসুস্থতার খবর ঘিরে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে তার বিপুল সংখ্যক সমর্থক ও শুভাকাঙ্ক্ষীর ভিড় জমায়েত হতে দেখা গেছে। দলের পক্ষ থেকে বারবার ভিড় না করার অনুরোধ জানানো সত্ত্বেও, নেত্রীর স্বাস্থ্যের সর্বশেষ পরিস্থিতি জানতে এবং একনজর দেখার সুযোগ না পেলেও নীরবে অপেক্ষা করতে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে এসেছেন তারা। এই মুহূর্তে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা এবং প্রার্থনাই যেন ‘খালেদা প্রেমীদের’ প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছে।
রবিবার (৩০ নভেম্বর ২০২৫) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনের এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে এই ভিড়ের চিত্র দেখা গেছে। হাসপাতাল সূত্র ও দলের কর্মীদের মাধ্যমে জানা যায়, বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার উন্নতি-অবনতির একটি দোলাচল চলছে এবং তার চিকিৎসায় গঠিত বহুজাতিক মেডিকেল বোর্ড নিবিড় পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক অঙ্গন এবং পরিবারের অভ্যন্তরে উদ্বেগ বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালের সামনে আগ্রহীদের আনাগোনা স্বাভাবিকভাবেই শুরু হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে, বিএনপির সিনিয়র নেতৃত্ব হাসপাতালের প্রবেশপথ অবরুদ্ধ না করতে, জটলা তৈরি না করতে এবং চিকিৎসা কার্যক্রমে কোনো বাধা সৃষ্টি না করার জন্য স্পষ্ট নির্দেশনা জারি করেন। তবে শনিবার এবং রবিবার সকালেও এভারকেয়ারের সামনে সাধারণ মানুষ ও কর্মীদের উপস্থিতি লক্ষণীয় ছিল।
সরেজমিনে আরও দেখা যায়, হাসপাতালের ঠিক সামনেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর সতর্কতায় অবস্থান নিয়েছে এবং প্রবেশপথে ব্যারিকেড তৈরি করা হয়েছে। ফুটপাত এবং সড়কের একাংশজুড়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা দলটির কর্মী-সমর্থকরা অবস্থান নিয়েছেন। তারা সরাসরি হাসপাতালে প্রবেশ করতে না পারলেও, কাছাকাছি এই অবস্থানটুকুকে তারা নেত্রীর প্রতি দায়িত্ববোধ ও সংহতির একটি নীরব প্রকাশ হিসেবে দেখছেন।
হাসপাতালের গেটের সামনে কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরসহ বিভিন্ন জেলা থেকে আসা বেশ কয়েকজন সমর্থককে দেখা যায়। তারা কেউ বাস, কেউ ট্রেন, আবার কেউ হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে ঢাকায় এসেছেন।
নাজমুল আলম নামে একজন নেতা তার আবেগ প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের প্রিয় নেত্রী মৃত্যুশয্যায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। চাইলেও আমরা ঘরে বসে থাকতে পারি না। গতকালও গভীর রাত পর্যন্ত হাসপাতালের সামনে ছিলাম। আত্মার টানে আজ আবারও সকালে চলে এসেছি। ভেতরে ঢোকার সুযোগ নেই, তাই দূরে দাঁড়িয়ে আছি। কিন্তু মন টানলে বাসায় থাকা যায় না।”
আরেকজন সমর্থক জানান, “উনার শারীরিক অবস্থা ওঠানামা করছে বলে শুনেছি। যেটুকু পারি, দোয়া করছি। উনি ভালো হোক—এই একটাই দোয়া।”
কিশোরগঞ্জ থেকে আসা টিপু সুলতান নামক এক খালেদাপ্রেমী দুই দিন ধরে হাসপাতালের সামনে অবস্থান করছেন। আবেগতাড়িত হয়ে তিনি দাবি করেন, প্রয়োজনে নিজের ফুসফুস দিয়েও বেগম খালেদা জিয়াকে বাঁচাতে তিনি প্রস্তুত। তার পরিবার, ব্যবসা, থাকার জায়গা—সবকিছুর বাইরে এখন তার একমাত্র লক্ষ্য নেত্রীর সুস্থতা।
টিপু সুলতান জানান, ফেসবুক ও ইউটিউবে খবর দেখে তিনি আর ঘরে বসে থাকতে পারেননি। সকালে নিজের ছোট দোকানটি খুলে দিয়েই দুপুরের ট্রেনে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন এবং বিমানবন্দর স্টেশনে নেমে সরাসরি এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে চলে আসেন। তার ভাষায়, “খালেদা জিয়া যদি বাঁচেন, আর ডাক্তাররা যদি বলেন আমার ফুসফুস কাজে লাগবে, আমি দিতে রাজি। আল্লাহ আমাকে যতটা শক্তি দিয়েছে, সবটুকুই দেব।”
এদিকে, বিএনপির পক্ষ থেকে নেতাকর্মীদের হাসপাতালের সামনে ভিড় না করার জন্য কড়া নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। দলটি জোর দিয়ে বলেছে যে, হাসপাতালের সামনে জটলা তৈরি হলে অন্যান্য রোগী এবং চিকিৎসকদের কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটতে পারে। পরিস্থিতি শান্ত রাখা এবং চিকিৎসকদের কাজ নির্বিঘ্ন রাখা এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিএনপি জানিয়েছে, বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসা সংক্রান্ত বিষয়ে গণমাধ্যমে ব্রিফ করবেন বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। এছাড়াও, অন্যান্য সাংগঠনিক বিষয়ে দলের গৃহীত সিদ্ধান্ত গণমাধ্যমে ব্রিফ করবেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। এই নির্দেশনাটি কর্মীদের কাছে তথ্য পৌঁছানোর একটি সুশৃঙ্খল প্রক্রিয়া বজায় রাখার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও জানিয়েছে, প্রতিদিনের চাপ ও রোগীসেবা বজায় রাখতে পরিস্থিতি শান্ত থাকা প্রয়োজন। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ভিড় যেন জরুরি সেবা বিঘ্নিত না করে, সে বিষয়ে অভ্যন্তরীণভাবে নির্দেশনা জোরদার করা হয়েছে।

