যুক্তরাষ্ট্রের নবনিযুক্ত ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতির প্রভাবে আবারও বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়েছেন বিশ্বজুড়ে অভিবাসনপ্রত্যাশীরা। বিশেষ করে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য অভিবাসন ভিসা (Immigrant Visa) স্থগিতের আকস্মিক ঘোষণায় হাজারো বাংলাদেশি পরিবারের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন এখন অনিশ্চয়তার আবর্তে। গত কয়েক বছর ধরে যারা পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলনের আশায় প্রহর গুনছিলেন, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এই নতুন সিদ্ধান্তে তাদের সেই অপেক্ষা অনির্দিষ্টকালের জন্য দীর্ঘায়িত হলো।
দীর্ঘ তিন দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত প্রবাসীদের থেকে শুরু করে সম্প্রতি উচ্চশিক্ষার জন্য যাওয়া শিক্ষার্থী—সবার মধ্যেই এখন বিরাজ করছে গভীর উদ্বেগ ও মানসিক উৎকণ্ঠা। শুধু নতুন আবেদনকারীই নন, বরং যারা ইতোমধ্যে মার্কিন নাগরিকত্ব বা গ্রিন কার্ড পেয়েছেন, তারাও বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রশাসনিক জটিলতার আশঙ্কা করছেন।
মার্কিন প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তের পেছনে কাজ করছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত ‘পাবলিক চার্জ’ নীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত কঠোর অবস্থান। গত নভেম্বরে ওয়াশিংটন ডিসিতে ন্যাশনাল গার্ড সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনার প্রেক্ষাপটে অভিবাসন প্রক্রিয়া নিয়ে যে কড়াকড়ি শুরু হয়েছিল, তার ধারাবাহিকতায় এই ৭৫টি দেশের তালিকা প্রকাশ করা হয়।
২১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই নির্দেশনায় বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট সময়সীমা ছাড়াই এসব দেশের নাগরিকদের অভিবাসন ভিসা প্রদান বন্ধ থাকবে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র টমি পিগট স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, যারা ভবিষ্যতে মার্কিন সরকারের জনকল্যাণমূলক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারেন, তাদের প্রবেশাধিকার সীমিত করাই এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য। মার্কিন প্রশাসনের দাবি, অনেক অভিবাসী যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের পর কর্মসংস্থানের চেয়ে সরকারি সুযোগ-সুবিধার ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েন, যা দেশটির অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
এই সিদ্ধান্তের ফলে ব্যক্তিগত জীবনে নেমে আসা বিপর্যয়ের চিত্রটি অত্যন্ত করুণ। বাকের মজুমদারের (ছদ্মনাম) মতো প্রবাসীরা, যারা নব্বইয়ের দশকে রাজনৈতিক আশ্রয়ের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে থিতু হয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে নাগরিকত্ব পেয়েছেন, তারাও আজ এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপের মুখে। তিনি মনে করেন, মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের তথ্য গোপন করে সরকারি সুবিধা গ্রহণ বা অবৈধ পন্থায় আশ্রয় প্রার্থনার দায় এখন পুরো বাংলাদেশি কমিউনিটির ওপর এসে পড়ছে।
তার মতে, ‘নগর পুড়লে দেবালয় রক্ষা পায় না’—অর্থাৎ সামগ্রিক কড়াকড়ির প্রভাব থেকে বৈধ অভিবাসীরাও মুক্ত নন। বিশেষ করে যারা অতীতে রাজনৈতিক আশ্রয় বা অ্যাসাইলাম নিয়েছিলেন, তাদের পুরনো নথিগুলো পুনরায় যাচাই বা ‘রিভিউ’ করার যে ইঙ্গিত ট্রাম্প প্রশাসন দিয়েছে, তা প্রবাসীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। এর ফলে অনেক গ্রিন কার্ডধারী এখন জরুরি প্রয়োজনেও বাংলাদেশে আসতে দ্বিধা বোধ করছেন, কারণ ফিরে যাওয়ার সময় বিমানবন্দরে অনাকাঙ্ক্ষিত জেরার মুখে পড়ার ভয় কাজ করছে তাদের মনে।
অন্যদিকে, পারিবারিক পুনর্মিলন বা ‘ফ্যামিলি স্পন্সরশিপ’ প্রক্রিয়ায় থাকা ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। রেহনুমা রহমানের (ছদ্মনাম) মতো তরুণীরা, যারা যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ শেষে মার্কিন নাগরিককে বিয়ে করে স্থায়ী হওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন, তাদের পরিকল্পনা এখন ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম। বিয়ের সামাজিক অনুষ্ঠান বা দেশে ফেরার পরিকল্পনা থমকে গেছে শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক আদেশের কারণে।
মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের তথ্যমতে, আবেদনকারীরা সাক্ষাৎকার দিতে পারলেও চূড়ান্ত ভিসা ইস্যু করা হবে না। এই ঝুলন্ত অবস্থাটি আবেদনকারীদের জন্য চরম মানসিক যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান, আফগানিস্তান, নেপাল ও ভূটানও এই নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকায় পুরো অঞ্চলের অভিবাসন প্রবাহে একটি বড় ধাক্কা লেগেছে।
শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও ভবিষ্যতের কর্মসংস্থান বা স্ট্যাটাস পরিবর্তনের পথটি আগের চেয়ে অনেক বেশি কণ্টকাকীর্ণ হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা শেষে সাধারণত এক থেকে তিন বছরের কাজের সুযোগ (OPT) পাওয়া যায়, কিন্তু নতুন নীতিমালায় স্পন্সরশিপের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ চাওয়া হতে পারে।
দক্ষ কর্মীদের জন্য এইচ-ওয়ানবি (H-1B) ভিসার আকাশচুম্বী ফি এবং জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বাতিলের মতো কঠোর পদক্ষেপগুলো নির্দেশ করছে যে, ট্রাম্প প্রশাসন কেবল অবৈধ অভিবাসন নয়, বরং বৈধ অভিবাসনের পথগুলোকেও সংকুচিত করতে বদ্ধপরিকর। সব মিলিয়ে, মার্কিন মুলুকে বাংলাদেশি প্রবাসীদের জন্য আগামী দিনগুলো হতে যাচ্ছে গভীর পর্যবেক্ষণ ও ধৈর্যের পরীক্ষা। এই ভিসা স্থগিতাদেশ কতদিন বজায় থাকবে বা ভবিষ্যতে শর্তগুলো আরও কতটা কঠিন হবে, তা নিয়ে বর্তমানে কোনো সুনির্দিষ্ট পূর্বাভাস নেই।

