বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনের অন্যতম শক্তিশালী ও শ্রদ্ধেয় নাম ডলি জহুর। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত এই গুণী অভিনেত্রী দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বড় পর্দা থেকে দূরে ছিলেন। ২০১১ সালের পর তাকে আর নতুন কোনো সিনেমায় দেখা যায়নি। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি টেলিভিশন নাটকে নিয়মিত কাজ করলেও রূপালি পর্দার দর্শকরা তার অভাব বোধ করছিলেন। তবে চলচ্চিত্র প্রেমীদের জন্য সুখবর হলো, ২০২৬ সালে অত্যন্ত শক্তিশালী দুটি গল্পের মাধ্যমে পুনরায় বড় পর্দায় ফিরছেন এই কিংবদন্তি শিল্পী। ভিন্নধর্মী নির্মাণশৈলী এবং মৌলিক গল্পের টানেই তিনি তার দীর্ঘদিনের অবসরের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছেন বলে জানা গেছে।
পরিচালক ইয়ামিন ইলানের নির্মাণে ‘ঝামেলা’ সিনেমার মাধ্যমেই ডলি জহুরের এই প্রত্যাবর্তন ঘটছে। ‘দিয়া প্রোডাকশনস’-এর ব্যানারে নির্মিত এই সিনেমাটি মূলত একটি মৌলিক পারিবারিক টানাপোড়েনের গল্প নিয়ে সাজানো হয়েছে। নির্মাতা ইয়ামিন ইলান জানিয়েছেন, ডলি জহুর প্রথমে চলচ্চিত্রে অভিনয়ের ব্যাপারে কিছুটা অনাগ্রহী ছিলেন। তবে চিত্রনাট্য পড়ার পর এবং গল্পের গভীরতা অনুধাবন করে তিনি কাজটিতে সম্মতি দেন। নির্মাতার বিশ্বাস, ডলি জহুরের প্রাণবন্ত অভিনয় এই সিনেমার পারিবারিক আবহকে আরও জীবন্ত করে তুলবে, যা দর্শকদের হৃদয়ে সরাসরি জায়গা করে নেবে।
‘ঝামেলা’ সিনেমায় ডলি জহুর ছাড়াও একঝাঁক মেধাবী শিল্পী অভিনয় করছেন। এতে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে রয়েছেন শ্যামল মাওলা, তানজিকা আমিন, রাশেদ মামুন অপু, কাজী নওশাবা আহমেদ এবং আবু হুরায়রা তানভীর। এছাড়া সাবেরী আলম, ইকবাল হোসেইন, ফারহানা ইয়াসমিন ইভাসহ শিশুশিল্পী জান্নাহ ও আদৃতার উপস্থিতি সিনেমাটিতে যোগ করেছে নতুন মাত্রা। বর্তমানে এই সিনেমার শেষ পর্যায়ের শুটিং চলছে এবং চলতি বছরের যেকোনো একটি বড় উৎসবে বা ঈদে এটি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সংশ্লিষ্টদের।
কেবল ‘ঝামেলা’ নয়, প্রখ্যাত নির্মাতা রেদওয়ান রনির বহুল আলোচিত সিনেমা ‘দম’-এও একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করছেন ডলি জহুর। এই সিনেমায় তাকে জনপ্রিয় অভিনেতা আফরান নিশোর মায়ের ভূমিকায় দেখা যাবে। সত্য ঘটনার অনুপ্রেরণায় তৈরি এই চলচ্চিত্রে আরও অভিনয় করছেন চঞ্চল চৌধুরী ও পূজা চেরির মতো তারকারা। উল্লেখ্য যে, এই সিনেমার একটি বিশাল অংশের চিত্রধারণ করা হয়েছে কাজাখস্তানের মনোরম সব লোকেশনে। বর্তমানে এর নির্মাণ কাজও শেষের দিকে এবং আসছে রোজার ঈদে সিনেমাটি বিশ্বব্যাপী মুক্তির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
দীর্ঘ এক যুগ পর সিনেমায় ফেরা প্রসঙ্গে ডলি জহুর সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তার মনোভাব স্পষ্ট করেছেন। তিনি জানান, প্রথাগত বাণিজ্যিক বা ফর্মুলা নির্ভর সিনেমায় অভিনয়ের আর কোনো ইচ্ছা তার নেই। তবে বর্তমানে নির্মাতারা যেভাবে জীবনঘনিষ্ঠ ও শৈল্পিক সিনেমা বানাচ্ছেন, তা তাকে আকৃষ্ট করেছে। তিনি বলেন, “আসলে সিনেমায় ফেরার ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু ‘ঝামেলা’ ও ‘দম’—এই দুটি সিনেমার গল্প শোনার পর এবং নির্মাতাদের দৃষ্টিভঙ্গি দেখে মনে হয়েছে এই কাজগুলো করা প্রয়োজন। এছাড়া এই সিনেমাগুলোতে আমার নাটকের দীর্ঘদিনের সহকর্মীরা রয়েছেন, যাদের সাথে আমার আত্মার যোগাযোগ। সব মিলিয়েই আবার ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো।”
ডলি জহুরের এই প্রত্যাবর্তন ঢালিউডের জন্য একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন চলচ্চিত্র সমালোচকরা। তাদের মতে, বর্তমানে বাংলাদেশের সিনেমা যে নতুন রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সেখানে ডলি জহুরের মতো অভিজ্ঞ শিল্পীদের অংশগ্রহণ তরুণ নির্মাতাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেবে। গত বছরগুলোতে এফডিসি-কেন্দ্রিক রাজনীতির কারণে তিনি কিছুটা বিমুখ থাকলেও, নতুন ধারার এই সিনেমাগুলো তাকে আবারও তার প্রিয় আঙিনায় ফিরিয়ে এনেছে। এক যুগের এই প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে বড় পর্দায় ডলি জহুরের ফিরে আসা দর্শকদের জন্য নিঃসন্দেহে বড় একটি প্রাপ্তি হতে যাচ্ছে।

