ইরানের চলমান অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও গণবিক্ষোভকে কেন্দ্র করে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচি এক চাঞ্চল্যকর দাবি করেছেন। তেহরানের ভাষ্যমতে, বিদেশি শক্তির মদতে সাধারণ বিক্ষোভ এখন একটি ‘সন্ত্রাসী যুদ্ধে’ রূপ নিয়েছে।
তবে এই প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও দেশের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা সরকারের ‘সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে’ রয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আশ্বস্ত করেছেন তিনি। একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে আরাগচি জানিয়েছেন, ওয়াশিংটনের সাথে ‘যুদ্ধ কিংবা সংলাপ’—যেকোনো পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে ইরান বর্তমানে পুরোপুরি প্রস্তুত।
সোমবার রাজধানী তেহরানে নিযুক্ত বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের সাথে এক বিশেষ মতবিনিময় সভায় বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের ব্যাখ্যা দেন আরাগচি। তিনি অভিযোগ করেন, বিক্ষোভের আড়ালে একদল সন্ত্রাসী গোষ্ঠী দেশজুড়ে নাশকতা চালাচ্ছে এবং সাধারণ নাগরিকদের পাশাপাশি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদেরও লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে।
তার দাবি, এই সন্ত্রাসীরা দেশের বাইরে থেকে সরাসরি নির্দেশনা ও অর্থায়ন পাচ্ছে। আরাগচি বলেন, “সরকারের কাছে এমন কিছু অডিও ক্লিপ ও তথ্যপ্রমাণ রয়েছে, যা প্রমাণ করে যে দেশের অভ্যন্তরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য বিদেশ থেকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা পাঠানো হচ্ছে।” তিনি দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করেন যে, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সামরিক বাহিনী ও প্রশাসন সদা তৎপর এবং সন্ত্রাসীদের কোনো অশুভ উদ্দেশ্য সফল হতে দেওয়া হবে না।
ইরানের এই সংকটের জন্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি ও হস্তক্ষেপকে দায়ী করেন। আরাগচির মতে, ট্রাম্পের অযাচিত মন্তব্য ও সমর্থন মূলত বিদেশি মদতপুষ্ট সন্ত্রাসীদের উৎসাহিত করছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, আরাগচির এই বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের অনড় অবস্থান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তাদের কড়া বার্তা স্পষ্ট করে দেয়।
বিগত দুই সপ্তাহ ধরে ইরানে যে গণবিক্ষোভ চলছে, তার মূলে রয়েছে দেশটির চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়। কয়েক দশক ধরে চলা নিষেধাজ্ঞা এবং অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার ফলে ইরানি মুদ্রার (রিয়াল) মান ঐতিহাসিকভাবে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। বর্তমানে এক মার্কিন ডলারের বিপরীতে মুদ্রার বিনিময় হার প্রায় ৯ লাখ ৯৪ হাজার ৪৫৫ রিয়ালে এসে দাঁড়িয়েছে।
মুদ্রার এই অভাবনীয় অবমূল্যায়নের ফলে আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতি সৃষ্টি হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়। খাদ্যসামগ্রী, ওষুধ এবং অন্যান্য মৌলিক চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে দেশটির সিংহভাগ জনগণ।
উল্লেখ্য যে, গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের প্রধান বাজারের ব্যবসায়ীদের ধর্মঘট থেকে এই বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়। জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে শুরু হওয়া সেই আন্দোলন দ্রুত দাবানলের মতো ইরানের ৩১টি প্রদেশের প্রায় প্রতিটি শহর ও গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, দেশজুড়ে সাধারণ জনজীবন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুরু থেকেই বিক্ষোভকারীদের প্রতি তার প্রকাশ্য সমর্থন ব্যক্ত করে আসছেন এবং ইরান সরকার যদি বলপ্রয়োগের মাধ্যমে বিক্ষোভ দমনের চেষ্টা করে, তবে সামরিক অভিযানেরও হুমকি দিয়ে রেখেছেন।
এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান কিছুটা নরম অবস্থান গ্রহণের ইঙ্গিত দিয়েছেন। গতকাল রোববার এক বিবৃতিতে তিনি দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি ঢেলে সাজানোর প্রতিশ্রুতি দেন এবং জনগণকে আশ্বস্ত করেন যে, সরকার তাদের যৌক্তিক দাবি ও অভাব-অভিযোগ শোনার জন্য প্রস্তুত।
তবে সরকারের এই আশ্বাসে বিক্ষোভকারীরা শান্ত হবে কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে সংশয় রয়ে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী এই দেশটির বর্তমান পরিস্থিতি কেবল আঞ্চলিক নয়, বরং বিশ্ব রাজনীতিতেও নতুন উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে।

