ইন্দোনেশীয়-আমেরিকান বংশোদ্ভূত প্রখ্যাত মডেল মানোহারা ওডেলিয়া দীর্ঘ দেড় দশক পর তার জীবনের এক অন্ধকার অধ্যায় নিয়ে জনসমক্ষে মুখ খুলেছেন। ২০০৮ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে মালয়েশিয়ার কেলান্তান রাজ্যের রাজপুত্রের সঙ্গে তার কথিত বিবাহ এবং পরবর্তী সময়ে রাজপ্রাসাদে সহ্য করা অমানবিক নির্যাতনের ঘটনাগুলো আবারও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের শিরোনামে উঠে এসেছে।
সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত একটি খোলা চিঠিতে ৩৩ বছর বয়সী এই মডেল দাবি করেছেন, কিশোরী বয়সে তাকে বাধ্য করে যে সম্পর্কের জালে জড়ানো হয়েছিল, তাতে তার কোনো ন্যূনতম সম্মতি ছিল না। একইসঙ্গে তিনি গণমাধ্যমগুলোর প্রতি তাকে কোনো ‘রাজপুত্রের সাবেক স্ত্রী’ হিসেবে পরিচয় না দেওয়ার জন্য কড়া অনুরোধ জানিয়েছেন।
মানোহারার জীবনের এই ট্র্যাজেডি শুরু হয়েছিল ২০০৮ সালে, যখন কেলান্তানের সুলতানের ছেলে টেংকু মুহাম্মদ ফাখরি পেত্রা তাকে এক প্রকার জোরপূর্বক বিয়ে করেন। দীর্ঘ ১৫ বছর পর সেই দুঃসহ স্মৃতির রোমন্থন করে মানোহারা লেখেন, “আমার কিশোর বয়সে যা ঘটেছিল তা কোনো সুখের স্মৃতি নয়; সেখানে কোনো সম্মতির লেশমাত্র ছিল না।
এমনকি আইনগতভাবেও সেটিকে বৈধ বিয়ে বলা যায় না। আমি কখনোই এমন কোনো সম্পর্কে জড়াতে চাইনি, এতে আমার কোনো সম্মতি ছিল না এবং স্বেচ্ছায় আমি রাজপ্রাসাদের অংশ হইনি।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে সেই সময়ে তার কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার বা নিজের স্বাধীনতা রক্ষার সক্ষমতা ছিল না।
মানোহারার এই বয়ান মূলত রাজকীয় বিলাসিতার আড়ালে থাকা এক চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র ফুটিয়ে তোলে। ২০০৯ সালে রাজকীয় পরিবারের সঙ্গে সিঙ্গাপুর সফরের সময় তিনি অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে পালিয়ে আসতে সক্ষম হন। সেই রোমহর্ষক পলায়ন পর্বে তাকে সহায়তা করেছিল তার পরিবার, স্থানীয় পুলিশ এবং সিঙ্গাপুরে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তারা।
ইন্দোনেশিয়ায় ফিরে আসার পর মানোহারা তার ওপর চলা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ভয়াবহ বর্ণনা দিয়েছিলেন, যা সে সময় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। রাজকীয় রক্ষীবাহিনী ও কঠোর নিরাপত্তার বেষ্টনী ভেদ করে তার সেই মুক্তি ছিল বিশ্বজুড়ে নির্যাতিত নারীদের জন্য এক সাহসের প্রতীক।
বর্তমান সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে যখন তার পরিচয় হিসেবে ‘পেত্রার সাবেক স্ত্রী’ তকমাটি ব্যবহার করা হচ্ছে, তখন তিনি এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। মানোহারা লেখেন, “আমি ইন্দোনেশিয়ার গণমাধ্যম, সম্পাদক ও ডিজিটাল কন্টেন্ট লেখকদের অনুরোধ করছি, দয়া করে আমার পরিচয় দেওয়ার সময় ওই বিশেষ তকমাটি ব্যবহার বন্ধ করুন।
একজন ভুক্তভোগীকে তার নির্যাতনকারীর পরিচয়ে পরিচিত করা কেবল নিষ্ঠুরতাই নয়, বরং এটি বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার নীতিমালারও পরিপন্থী।” তিনি মনে করেন, ভুল তথ্য দিয়ে সংবাদ পরিবেশন বা কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত অতীতকে বারবার সামনে আনা একজন ব্যক্তির বর্তমান জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো মানোহারার এই সাহসিকতাকে সাধুবাদ জানাচ্ছে। তাদের মতে, রাজকীয় প্রভাব-প্রতিপত্তি ব্যবহার করে একজন অপ্রাপ্তবয়স্কের জীবন ধ্বংস করার এই ঘটনাটি বৈশ্বিক পর্যায়ে বাল্যবিবাহ এবং জবরদস্তিমূলক সম্পর্কের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তাকে আরও একবার সামনে এনেছে।
মানোহারা এখন তার মডেলিং ক্যারিয়ার ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নিজের নতুন পরিচয় গড়তে সচেষ্ট। তিনি বিশ্বাস করেন, তার এই খোলা চিঠি কেবল নিজের সম্মান পুনরুদ্ধারের জন্য নয়, বরং বিশ্বজুড়ে যারা নিঃশব্দে রাজকীয় বা প্রভাবশালী মহলের হাতে নির্যাতিত হচ্ছেন, তাদের কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করবে।

