মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা বলয়ে এক বিশাল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যকার কৌশলগত প্রতিরক্ষা জোটে (এসডিএমএ) তৃতীয় পক্ষ হিসেবে যোগ দিতে যাচ্ছে তুরস্ক। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের বরাত দিয়ে পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম জিও নিউজ এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছে। এই জোটের সম্প্রসারণকে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মুসলিম বিশ্বের সামরিক শক্তি সুসংহত করার একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে ‘স্ট্র্যাটেজিক মিউচ্যুয়াল ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট’ বা এসডিএমএ স্বাক্ষরিত হয়। যদিও দুই দেশের কোনো পক্ষই এই চুক্তির বিস্তারিত শর্তাবলী জনসমক্ষে প্রকাশ করেনি, তবে সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মতে, এই চুক্তির মূল ভিত্তি হলো সম্মিলিত নিরাপত্তা।
অর্থাৎ, চুক্তিবদ্ধ কোনো দেশের ওপর যদি বহিঃশক্তির কোনো আক্রমণ ঘটে, তবে অপর রাষ্ট্রটি আক্রান্ত দেশের পাশে সর্বাত্মক সামরিক শক্তি নিয়ে দাঁড়াবে। এই সামরিক সহযোগিতার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর দিক হলো পাকিস্তানের পরমাণু সক্ষমতা। মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর দেশ হিসেবে পাকিস্তানের এই প্রতিরক্ষা সরঞ্জামাদি চুক্তির আওতাভুক্ত থাকায় এর গুরুত্ব আন্তর্জাতিক মহলে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে।
অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকলেও পাকিস্তানের ছয় লক্ষাধিক সুপ্রশিক্ষিত সেনাসমৃদ্ধ সেনাবাহিনী বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক শক্তি হিসেবে স্বীকৃত। গত বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর এক সাক্ষাৎকারে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী এই জোটের প্রকৃতি ব্যাখ্যা করে বলেছিলেন যে, এই চুক্তিটি মূলত উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোট বা ন্যাটোর আদলে তৈরি করা হয়েছে। এটি সম্পূর্ণভাবে একটি প্রতিরক্ষামূলক জোট, যার কোনো আক্রমণাত্মক উদ্দেশ্য নেই। কোনো রাষ্ট্রে আগ্রাসন চালানোর লক্ষ্য এখানে রাখা হয়নি, বরং সদস্য দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলাই এর মূল উদ্দেশ্য।
তুরস্কের এই জোটে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বিষয়টি বৈশ্বিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটোর একমাত্র এশীয় সদস্য হওয়া সত্ত্বেও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছে।
এমতাবস্থায় মধ্য এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নিজেদের প্রভাব আরও সুসংহত করতে তুরস্ক বিকল্প শক্তিশালী বলয় খুঁজছে। বিশেষ করে এশিয়া ও আফ্রিকা অঞ্চলে আঙ্কারার ক্রমবর্ধমান প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্য পূরণে রিয়াদ ও ইসলামাবাদের সাথে এই কৌশলগত মিত্রতা অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।
ব্লুমবার্গের তথ্যানুযায়ী, এসডিএমএ জোটে তুরস্কের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে গত অক্টোবর মাস থেকেই ত্রিপক্ষীয় পর্যায়ে নিবিড় আলোচনা চলছিল। দীর্ঘ আলোচনার পর বর্তমানে এই প্রক্রিয়াটি একেবারে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। আনুষ্ঠানিক কিছু প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেই তুরস্ক এই জোটে যোগ দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই তিন শক্তিশালী মুসলিম রাষ্ট্রের সামরিক সমন্বয় কেবল আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে না, বরং বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় একটি নতুন শক্তির কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করবে।

