আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে বইছে উত্তপ্ত হাওয়া। এই নির্বাচনে দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং আসন ভাগাভাগির সমীকরণ মেলাতে গিয়ে মনোনয়নবঞ্চিত ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিষয়ে কঠোর ও কৌশলী অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলটির নীতিনির্ধারকরা জানিয়েছেন, নির্বাচনের বৃহত্তর স্বার্থে যারা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়েছেন, তাদের বিষয়ে পর্যায়ক্রমে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) সকালে রাজধানীর গুলশানে দলের চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ের সামনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ দলের এই অবস্থানের কথা স্পষ্ট করেন। তিনি জানান, দলের ঐক্য সুসংহত রাখতে এবং নির্বাচনী রণকৌশল সফল করতে বিদ্রোহীদের বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
বিএনপির মতো একটি বিশাল রাজনৈতিক দলে যোগ্য প্রার্থীর অভাব নেই। ফলে অনেক আসনেই একাধিক হেভিওয়েট নেতা মনোনয়নের দাবিদার ছিলেন। সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, “একটি বৃহৎ গণতান্ত্রিক দল হিসেবে অনেকেরই প্রত্যাশা থাকে এবং তা থাকাটা স্বাভাবিক। কিন্তু সংসদীয় গণতন্ত্রে বহু দলের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে গিয়ে আমাদের অনেক দক্ষ ও যোগ্য নেতাকে মনোনয়ন থেকে বঞ্চিত করতে হয়েছে। এটি তাদের জন্য কষ্টের হলেও দলের বৃহত্তর স্বার্থে তা মেনে নেওয়া প্রয়োজন।”
তিনি আরও জানান যে, যারা দলের মনোনয়ন পাননি কিন্তু প্রার্থী হিসেবে অনড় রয়েছেন, তাদের সঙ্গে শীর্ষ পর্যায় থেকে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করা হচ্ছে। অনেককে ডেকে বোঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে যেন তারা দলের প্রতি অনুগত থেকে নির্বাচনী লড়াইয়ে ঐক্যবদ্ধ থাকেন। তবে এর পরেও যারা দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে নির্বাচনী মাঠে বহাল রয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে সাংগঠনিক পদক্ষেপে যাওয়া শুরু হয়েছে। সালাহউদ্দিন আহমেদ আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি অধিকাংশ ক্ষেত্রে আলোচনার মাধ্যমে খুব শীঘ্রই একটি সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হবে।”
নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা চলাকালীন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উত্তরবঙ্গ সফর নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা গুঞ্জন ও নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের প্রশ্ন উঠেছে। এ প্রসঙ্গে বিএনপির এই সিনিয়র নেতা স্পষ্ট করে বলেন, তারেক রহমানের এই সফর কোনো নির্বাচনী প্রচারণার অংশ নয় বরং এটি একটি জাতীয় ও নৈতিক দায়িত্ব।
সালাহউদ্দিন আহমেদ মন্তব্য করেন, “২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে যারা জীবন উৎসর্গ করেছেন, সেই শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন এবং তাদের কবর জিয়ারত করা কেবল দলের প্রত্যাশা নয়, এটি গোটা জাতির প্রত্যাশা। এই অভ্যুত্থানকে আমরা হৃদয়ে ধারণ করি। তারেক রহমান সেই শহীদদের আত্মত্যাগকে মহিমান্বিত করতে সেখানে যাচ্ছেন। একে নির্বাচনী আচরণবিধির চশমায় দেখা উচিত নয়।” তিনি আরও অনুরোধ করেন যে, রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য যেন ২০২৪ সালের সেই মহান অভ্যুত্থান এবং শহীদদের মর্যাদাকে কেউ প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা না করে।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে জানানো হয়েছে যে, দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল হিসেবে এবং তার ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব হিসেবে তারেক রহমানের এই সফরের উদ্দেশ্য হলো জাতির বীর সন্তানদের সম্মান জানানো। এটি গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে আরও উচ্চস্তরে নিয়ে যাবে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি শক্তিশালী সংহতির বার্তা পৌঁছে দেবে। নির্বাচনী সমীকরণের বাইরেও জাতীয় সংহতির ক্ষেত্রে এই পদক্ষেপটি অত্যন্ত ইতিবাচক বলে দলটির নেতারা মনে করেন।
নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, বিএনপির জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে নিজেদের তৃণমূলের ক্ষোভ প্রশমন এবং জোটগত সমঝোতা বজায় রাখা। বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিয়ন্ত্রণে দলের এই কঠোর অবস্থান শেষ পর্যন্ত নির্বাচনী ফলাফলে কেমন প্রভাব ফেলে, তা এখন দেখার বিষয়।

