ভূমধ্যসাগরের উত্তাল ঢেউ পেরিয়ে ইউরোপের উন্নত জীবনের স্বপ্ন যখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়, তখন সেই ধ্বংসস্তূপ থেকে প্রাণের সুরক্ষা পাওয়াটাই হয়ে ওঠে মুখ্য। সম্প্রতি মাল্টা উপকূলে তেমনই এক ভয়ংকর নৌকাডুবির ঘটনা থেকে উদ্ধার পাওয়ার মাত্র ১৭ দিনের মাথায় ৪৪ জন বাংলাদেশি নাগরিক বিশেষ ফ্লাইটে নিজ দেশে ফিরে এসেছেন।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন ইতিহাসে এত দ্রুততম সময়ে অভিবাসীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ঘটনাটি অত্যন্ত বিরল এবং নজিরবিহীন হিসেবে দেখা হচ্ছে। দ্বীপ রাষ্ট্র মাল্টার প্রশাসনের কঠোর নীতি এবং বাংলাদেশ দূতাবাসের সমন্বিত প্রচেষ্টায় এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে গত ১২ ডিসেম্বর, যখন ভূমধ্যসাগরের মাল্টা উপকূলে অভিবাসীবাহী একটি ছোট নৌকা ভয়াবহ দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। মাল্টার সশস্ত্র বাহিনীর একটি চৌকস দল দ্রুত উদ্ধার অভিযান চালিয়ে মোট ৬১ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করে।
উদ্ধারকৃতদের মধ্যে ৫৯ জনই ছিলেন বাংলাদেশি এবং বাকি দুজন মিসরের নাগরিক। উদ্ধারের সময় কয়েকজনের শারীরিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। দ্রুত চিকিৎসার জন্য হেলিকপ্টারযোগে দুজনকে হাসপাতালে পাঠানো হলেও দুর্ভাগ্যবশত একজন সেখানে মৃত্যুবরণ করেন। এই বিয়োগান্তক ঘটনাটি আবারও উন্মোচিত করেছে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রপথে ইউরোপে প্রবেশের ভয়াবহতাকে।
উদ্ধারের পর মাল্টা ইনডিপেনডেন্ট সহ স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো জানায়, ২৮ ডিসেম্বর রাতে একটি বিশেষ ফ্লাইটে ৪৪ জন অভিবাসীকে তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। যদিও শুরুতে তাদের জাতীয়তা নিয়ে রাখঢাক করা হয়েছিল, তবে পরবর্তীতে বাংলাদেশের ইমিগ্রেশন পুলিশের তথ্যে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, ফেরত পাঠানো ৪৪ জনই বাংলাদেশি নাগরিক।
২৯ ডিসেম্বর বিকেলে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণকারী একটি বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটে তারা দেশে পৌঁছান। ইমিগ্রেশন পুলিশের ভাষ্যমতে, ফিরে আসা এই অভিবাসীদের সবাই পুরুষ এবং তাদের অনেকেই সমুদ্রের লোনা পানি আর নৌকার জ্বালানিতে শরীরের বিভিন্ন অংশ পুড়ে গিয়ে মারাত্মক আহত ছিলেন।
তবে এই ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়াটিকে ‘জোরপূর্বক বিতাড়ন’ বা ‘ডিপোর্টেশন’ হিসেবে দেখতে নারাজ গ্রিসের এথেন্সে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস। মাল্টার অনাবাসিক দূতাবাস হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী এথেন্স দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি রাবেয়া বেগম এই প্রক্রিয়াটিকে ‘স্বেচ্ছা প্রত্যাবাসন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি জানান, উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশিরা ভয়াবহ মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন।
সমুদ্রের দীর্ঘ যাত্রায় নৌকার জ্বালানি তেলের সংস্পর্শে এসে তাদের অনেকের হাত ও পা পুড়ে গিয়েছিল। হাসপাতালে চিকিৎসা চলাকালীন তারা সবাই নিজেদের ইচ্ছায় দেশে ফিরে আসার আকুতি জানিয়েছিলেন। তাদের এই আকুল আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই মাল্টা সরকার ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়ে দ্রুত এই প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করে। এমনকি মানবিক দিক বিবেচনা করে মাল্টা সরকার ফিরে যাওয়া বাংলাদেশিদের প্রত্যেককে নির্দিষ্ট পরিমাণ আর্থিক সহযোগিতাও প্রদান করেছে।
ইউরোপীয় ট্র্যাভেল অ্যান্ড আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম (ইটিআইএএস)-এর তথ্যানুসারে, সাধারণ প্রক্রিয়ায় একজন অভিবাসীকে তার নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে কয়েক মাস এমনকি কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়। কিন্তু মাল্টা সরকার পুলিশ, স্বরাষ্ট্র এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের মাধ্যমে এই কাজটি মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে সম্পন্ন করেছে।
মাল্টার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাইরন ক্যামিলেরি এই দ্রুত প্রত্যাবাসন নীতিকে তার সরকারের একটি ‘ন্যায্য’ ও ‘শক্তিশালী’ অবস্থান হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, যারা প্রকৃত অর্থেই শরণার্থী হিসেবে সুরক্ষার দাবিদার, তাদের জন্য মাল্টার দরজা উন্মুক্ত। কিন্তু যারা মানবপাচারকারীদের হাত ধরে বেআইনিভাবে ব্যবস্থার অপব্যবহার করতে চায়, তাদের দ্রুত ফেরত পাঠানো হবে। এটি মানবপাচারকারীদের একটি কড়া বার্তা হিসেবেও কাজ করবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
মাল্টা সরকারের কঠোর অভিবাসন নীতির প্রতিফলন দেখা যায় তাদের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানেও। ২০২৫ সালে দেশটিতে আসা অনিয়মিত অভিবাসীদের প্রায় ৮১ শতাংশকেই দ্রুত নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন এন্ট্রি-এক্সিট সিস্টেমের মাধ্যমে অননুমোদিত প্রবেশকারীদের শনাক্ত করা এখন আরও সহজ হয়ে পড়েছে।
বিশেষ করে আঙুলের ছাপ ও মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে ইউরোপের সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অনেক বেশি কড়াকড়ি করা হয়েছে। তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে মাল্টা সীমান্তে আগত অনিয়মিত অভিবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশিরাই ছিলেন সংখ্যাগরিষ্ঠ, যা বাংলাদেশের বৈদেশিক শ্রমবাজার ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির জন্য এক উদ্বেগজনক সংকেত।
সবমিলিয়ে, মাল্টা থেকে এই ৪৪ বাংলাদেশির ফেরা কেবল একটি সাধারণ প্রত্যাবাসন নয়, বরং এটি অবৈধ অভিবাসনের পরিণাম এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির কঠোর বাস্তবতার এক প্রতিচ্ছবি। একদিকে প্রাণের মায়া ছেড়ে বিপজ্জনক সমুদ্র পাড়ি দেওয়া, আর অন্যদিকে ইউরোপীয় দেশগুলোর কঠোর আইন—এই দুয়ের মাঝে পিষ্ট হচ্ছে হাজারো স্বপ্ন।
মাল্টার এই দ্রুত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আগামী দিনে মানবপাচারের অবৈধ পথগুলোকে কতটা চ্যালেঞ্জ করতে পারবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। তবে যারা ফিরে এসেছেন, তারা প্রাণে বেঁচে ফিরে আসাকেই জীবনের দ্বিতীয় সুযোগ হিসেবে দেখছেন।

