ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ এখন এক নতুন ও অভাবনীয় মোড় নিয়েছে। সম্প্রতি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এক বিতর্কিত ও সাহসী বার্তায় রাশিয়ার চেচেন প্রজাতন্ত্রের প্রধান রমজান কাদিরভকে অপহরণ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি সরাসরি আহ্বান জানিয়েছেন। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে মার্কিন অভিযানের উদাহরণ টেনে জেলেনস্কি দাবি করেছেন যে, কাদিরভের মতো প্রভাবশালী রুশ সহযোগীকে বন্দি করা সম্ভব হলে তা সরাসরি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে একটি কঠোর বার্তা দেবে। জেলেনস্কির মতে, পুতিনকে ‘উচিত শিক্ষা’ দিতে এবং ইউক্রেনে শান্তি স্থাপনে তাকে বাধ্য করতে এমন একটি পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।
গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রামে দেওয়া এক বিশেষ বিবৃতিতে জেলেনস্কি ভেনেজুয়েলায় সফল অভিযানের জন্য মার্কিন সরকারকে অভিনন্দন জানান। তিনি উল্লেখ করেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী যেভাবে দ্রুততার সঙ্গে তাদের লক্ষ্য অর্জন করেছে, তা পুরো বিশ্বের কাছে একটি শক্তিশালী উদাহরণ। জেলেনস্কি তার বার্তায় লেখেন, “পুরো বিশ্ব আজ মার্কিন অভিযানের ফলাফল দেখছে।
তাদের সেনাবাহিনী অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কাজটি সম্পন্ন করেছে। এখন সময় এসেছে রমজান কাদিরভের বিরুদ্ধে একই ধরনের একটি অভিযান পরিচালনা করার। পুতিনকে যদি প্রকৃতপক্ষেই শান্তি আলোচনায় বসাতে হয়, তবে তার এই ঘনিষ্ঠ সহযোগীকে আঘাত করা প্রয়োজন। এমন পদক্ষেপ নিলে পুতিন ইউক্রেনে যুদ্ধ বন্ধের বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করতে বাধ্য হবেন।”
ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্টের এই বিস্ফোরক মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় চেচেন নেতা রমজান কাদিরভ পাল্টা জবাব দিতে বিন্দুমাত্র দেরি করেননি। জেলেনস্কির পোস্টের কিছুক্ষণের মধ্যেই নিজের টেলিগ্রাম চ্যানেলে একটি কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন তিনি। কাদিরভ উপহাসের সুরে জেলেনস্কিকে ‘ভাঁড়’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, “ওই ব্যক্তি নিজে কিছু করার সাহস রাখে না, বরং মার্কিন সরকারের কাছে আমাকে অপহরণ করার আবদার জানাচ্ছে।
একজন প্রকৃত সাহসী মানুষের মতো নিজে হুমকি দেওয়ার ক্ষমতা তার নেই। আসলে সে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজটি করুক আর সে নিরাপদ দূরত্বে বসে তামাশা দেখুক।” কাদিরভের এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, জেলেনস্কির এই প্রস্তাবকে তিনি কেবল হাস্যকরই নয়, বরং কাপুরুষোচিত হিসেবে দেখছেন।
রমজান কাদিরভ রাশিয়ার রাজনীতিতে এক অত্যন্ত প্রভাবশালী ও আলোচিত নাম। ভ্লাদিমির পুতিনের অন্ধ অনুগত হিসেবে পরিচিত এই নেতা নিজেকে প্রায়শই ‘পুতিনের পদাতিক সৈন্য’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকেন। ২০০৭ সাল থেকে রাশিয়ার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ চেচেন প্রজাতন্ত্রের শাসনের দায়িত্বে থাকা কাদিরভ ক্রেমলিনের প্রতিটি সিদ্ধান্তে অটল সমর্থন দিয়ে আসছেন।
১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকে চেচেন বিচ্ছিন্নতাবাদীরা দুবার স্বাধীনতা লাভের চেষ্টা করলেও মস্কোর সহায়তায় কাদিরভ সেই বিদ্রোহ কঠোর হস্তে দমন করেন। সেই রক্তাক্ত যুদ্ধে রুশ বাহিনীর পক্ষে তার অবস্থান তাকে পুতিনের অন্যতম বিশ্বস্ত মিত্রে পরিণত করে।
বর্তমানে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের চতুর্থ বছরে পদার্পণ করার এই সন্ধিক্ষণে কাদিরভ কেবল রাজনৈতিক নেতাই নন, বরং যুদ্ধক্ষেত্রের অন্যতম শীর্ষ কমান্ডারের ভূমিকা পালন করছেন। তার নেতৃত্বাধীন বিশেষ চেচেন বাহিনী ইউক্রেনের ফ্রন্টলাইনগুলোতে অত্যন্ত সক্রিয়। এমন এক পরিস্থিতিতে জেলেনস্কির এই সরাসরি অপহরণের প্রস্তাব বৈশ্বিক কূটনীতিতে এক নতুন অস্থিরতা তৈরি করেছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মার্কিন প্রশাসন যদি জেলেনস্কির এই প্রস্তাবে সাড়া দেয়, তবে তা রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, জেলেনস্কি সম্ভবত রাশিয়ার অভ্যন্তরে অস্থিরতা তৈরি করে যুদ্ধ বন্ধের একটি বিকল্প কৌশল অবলম্বন করছেন। এই বাগযুদ্ধ আগামী দিনে রণক্ষেত্রের পরিস্থিতিতে কেমন প্রভাব ফেলে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

