ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ডামাডোলের মধ্যেই নির্বাচনী পরিবেশে বৈষম্য এবং কিছু রাজনৈতিক দলের প্রতি বিশেষ পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলেছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান। মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি ২০২৬) বিকেলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে এক জরুরি বৈঠক শেষে তিনি এই উদ্বেগের কথা জানান।
তার অভিযোগের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল নির্বাচনী প্রচারণায় কিছু দলের একচ্ছত্র আধিপত্য এবং বিশেষ রাষ্ট্রীয় প্রটোকল সুবিধা, যা একটি অংশগ্রহণমূলক ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মৌলিক শর্ত ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বা সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরির অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মাওলানা গাজী আতাউর রহমান সাংবাদিকদের সামনে অত্যন্ত পেশাদার ও ভারসাম্যপূর্ণ ভাষায় বলেন, বর্তমান নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে এক গভীর বৈষম্য পরিলক্ষিত হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, দেশের কিছু রাজনৈতিক দল অন্যগুলোর তুলনায় অস্বাভাবিক রকমের বিশেষ সুবিধা লাভ করছে।
এমনকি ওই দলগুলোর শীর্ষ নেতারা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মতো ‘ভিভিআইপি প্রটোকল’ ভোগ করছেন। একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রস্তুতিকালে এ ধরনের একপাক্ষিক রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য সাধারণ প্রার্থী ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর মনে আস্থার সংকট তৈরি করছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যদি নির্বাচনী ময়দানেই সমান অধিকার নিশ্চিত না হয়, তবে ভোটের ফলাফলে জনমতের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়।
মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশনের কঠোরতা এবং একে ঘিরে সৃষ্ট জটিলতা নিয়েও তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন গাজী আতাউর রহমান। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ইসলামী আন্দোলনের বেশ কিছু প্রার্থীর মনোনয়নপত্র অত্যন্ত নগণ্য এবং ঠুনকো অজুহাতে বাতিল করা হয়েছে।
তিনি উল্লেখ করেন, একজন প্রার্থীর মাত্র এক হাজার টাকার কম বিদ্যুৎ বিল বকেয়া থাকায় তার প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে, যা সংশোধনযোগ্য ছিল। অন্য এক প্রার্থীর ক্ষেত্রে ব্যাংকের নতুন অ্যাকাউন্টের স্টেটমেন্টে শুধুমাত্র ‘ওপেনিং ডেট’ উল্লেখ না থাকার মতো ক্লারিক্যাল ভুলের কারণে তাকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া কোথাও সামান্য স্বাক্ষর বিচ্যুতি বা ছোটখাটো তথ্যগত ভুলের ক্ষেত্রেও এবার কোনো নমনীয়তা দেখানো হয়নি।
গাজী আতাউর রহমান বলেন, ঋণখেলাপি হওয়া, তথ্য গোপন করা বা বড় কোনো ফৌজদারি মামলার মতো যৌক্তিক কারণে যদি মনোনয়ন বাতিল হতো, তবে তাকে ন্যায়বিচার হিসেবে মেনে নেওয়া যেত। কিন্তু যেসব বিষয় তাৎক্ষণিক সমাধান বা সংশোধনের সুযোগ রয়েছে, সেগুলো নিয়ে অহেতুক কড়াকড়ি করা প্রার্থীদের হয়রানি করার নামান্তর।
তিনি অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে বলেন যে, অতীতে এ ধরনের ছোটখাটো ভুলগুলোর ক্ষেত্রে প্রার্থীদের সংশোধনের সুযোগ দেওয়া হলেও এবার কমিশনের পক্ষ থেকে কোনো ছাড় মেলেনি। ফলে যোগ্য প্রার্থীরা শুধু প্রশাসনিক জটিলতার কারণে ইমেজ সংকটে পড়ছেন এবং ভোটারদের মধ্যেও এক ধরনের নেতিবাচক বার্তা যাচ্ছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এবার প্রায় ২৮ শতাংশের বেশি প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে, যা একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচনের জন্য মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়।
বৈঠকে নির্বাচনের সার্বিক নিরাপত্তা এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব পায়। মাওলানা গাজী আতাউর রহমান বলেন, একটি সন্ত্রাসমুক্ত নির্বাচনের জন্য অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা অপরিহার্য। যদিও নির্বাচন কমিশন দাবি করেছে যে লুট হওয়া অস্ত্রের প্রায় ৭০ শতাংশ উদ্ধার হয়েছে, কিন্তু তার মতে এখনো মাঠ পর্যায়ে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র রয়ে গেছে।
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর অস্ত্র উদ্ধারের যে গতি থাকা উচিত ছিল, বর্তমান প্রেক্ষাপটে তা যথেষ্ট নয় বলে তিনি মনে করেন। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, যদি নির্বাচনের আগে শতভাগ অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার না হয়, তবে ভোটকেন্দ্রে পেশী শক্তির প্রভাব বাড়ার ঝুঁকি থেকে যাবে।
পরিশেষে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনকে একটি নিরপেক্ষ ও বৈষম্যহীন ভূমিকা পালনের আহ্বান জানানো হয়। গাজী আতাউর রহমান স্পষ্ট করেন যে, তাদের লড়াই কেবল ক্ষমতার জন্য নয়, বরং একটি সুস্থ ও সুন্দর নির্বাচনী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য।
তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, কমিশন তাদের তোলা অভিযোগগুলো গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করবে এবং ভবিষ্যতে সকল দলের জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। অন্যথায়, নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে তা জনমনে অবিশ্বাসের দেয়াল আরও মজবুত করবে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

