লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক নজিরবিহীন অস্থিরতা ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। ভেনেজুয়েলায় সাম্প্রতিক মার্কিন সামরিক অভিযান এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক অপহরণের ঘটনায় আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। এই ঘটনার কঠোর সমালোচনা করে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শিনবাউম ওয়াশিংটনকে স্পষ্ট হুঁশিয়ারি প্রদান করেছেন।
মঙ্গলবার এক নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে মেক্সিকোর চিরাচরিত ও কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। শিনবাউম স্পষ্ট করে বলেন যে, মেক্সিকো কোনো অবস্থাতেই অন্য কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশি হস্তক্ষেপ বা আধিপত্যবাদী আচরণকে সমর্থন করে না। তার এই বক্তব্য মূলত লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর উপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী প্রতিবাদ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শিনবাউম তার বক্তব্যে মেক্সিকোর সংবিধান এবং জাতিসংঘ সনদের মূলনীতির কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, মেক্সিকোর পররাষ্ট্রনীতি সর্বদা অ-হস্তক্ষেপ এবং জাতিসমূহের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। ভেনেজুয়েলায় মার্কিন কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন বলে তিনি মনে করেন। তিনি অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সাথে উল্লেখ করেন যে, লাতিন আমেরিকার দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী ইতিহাস সাক্ষী দেয় যে বিদেশি হস্তক্ষেপ কখনোই কোনো দেশে টেকসই গণতন্ত্র বা স্থায়ী স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারেনি।
বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা গেছে, বহিঃশক্তির অনধিকার প্রবেশ সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদী সংঘাত ও মানবিক বিপর্যয় ডেকে এনেছে। ঐতিহাসিক এই বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিয়ে শিনবাউম জানান, মেক্সিকো তার প্রতিবেশী দেশগুলোর সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আপসহীন এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় তারা যেকোনো উসকানিমূলক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকবে।
ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতির দিকে তাকালে দেখা যায়, গত শনিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি নির্দেশে দেশটির রাজধানী কারাকাসে এক ভয়াবহ বিমান হামলা চালানো হয়। মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের পক্ষ থেকে একে একটি বিশেষ অভিযান হিসেবে দাবি করা হলেও এর ফলাফল ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। এই হামলায় কমপক্ষে ৮০ জন বেসামরিক ও সামরিক ব্যক্তির প্রাণহানি ঘটে, যা পুরো অঞ্চলকে শোকস্তব্ধ করে দিয়েছে।
হামলার পরবর্তী বিশৃঙ্খলার মধ্যে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস অপহৃত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ে। এই ঘটনা লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। মেক্সিকো সরকার এই অভিযানকে শুধুমাত্র একটি সামরিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে না, বরং একে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে গণ্য করছে।
মেক্সিকোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুয়ান রামন দে লা ফুয়েন্তে এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলেন যে, জাতিসংঘ বর্তমানে একটি অকার্যকর সংস্থায় পরিণত হয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম বহুপাক্ষিক কাঠামো হওয়া সত্ত্বেও সংস্থাটি শক্তিশালী দেশগুলোর আধিপত্য রোধ করতে পারছে না।
আন্তর্জাতিক আইন রক্ষায় জাতিসংঘের এই নিষ্ক্রিয়তা বিশ্বের ছোট ও মাঝারি দেশগুলোকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। লা ফুয়েন্তে মনে করেন, যখন একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র অন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রধানকে অপহরণ করার সাহস পায় এবং তাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো বাধা আসে না, তখন বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়। মেক্সিকো এই ব্যবস্থার সংস্কার এবং আন্তর্জাতিক আইনের কঠোর প্রয়োগের দাবি জানিয়ে আসছে।
এদিকে, ভেনেজুয়েলায় সফল অভিযানের পর ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরবর্তী লক্ষ্যবস্তু হতে পারে মেক্সিকো ও কলম্বিয়ার মতো প্রতিবেশী দেশগুলো—এমন গুঞ্জন ও ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের সাম্প্রতিক কিছু মন্তব্য মেক্সিকো সরকারের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, মেক্সিকোর বর্তমান সরকার সে দেশের শক্তিশালী মাদক কার্টেলদের ভয়ে তটস্থ এবং দেশটিতে আইনশৃঙ্খলা ফেরাতে মার্কিন সেনাবাহিনী পাঠানোর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
ট্রাম্পের এই বক্তব্যকে মেক্সিকোর সার্বভৌমত্বের প্রতি সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শিনবাউম অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে এই হুমকির মোকাবিলা করছেন। তিনি মার্কিন অভিযানের এই সম্ভাবনাকে সরাসরি নাকচ করে দিয়ে বলেন যে, তিনি এই ধরনের কোনো সামরিক পদক্ষেপের আশঙ্কা করছেন না এবং এ ধরনের রাজনৈতিক বাগাড়ম্বরকে খুব একটা গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন মনে করছেন না।
প্রেসিডেন্ট শিনবাউম আরও স্মরণ করিয়ে দেন যে, ট্রাম্পের পূর্ববর্তী মেয়াদেও তিনি মেক্সিকোতে মার্কিন সেনা পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন। মেক্সিকো সরকার সবসময়ই অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে আসছে। শিনবাউমের মতে, মেক্সিকোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কেবল মেক্সিকোর জনগণের এবং তাদের নির্বাচিত সরকারের।
বিদেশি কোনো শক্তির সহায়তার নাম করে সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ করার সুযোগ মেক্সিকো কাউকে দেবে না। তিনি বিশ্বাস করেন, আলোচনার মাধ্যমে এবং কূটনৈতিক উপায়ে যেকোনো সমস্যার সমাধান সম্ভব, কিন্তু সেখানে যদি জবরদস্তিমূলক কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তবে মেক্সিকো তার মর্যাদা রক্ষায় সর্বোচ্চ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
বর্তমানে লাতিন আমেরিকার ভূ-রাজনীতিতে মেক্সিকোর এই অবস্থান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক চাপ, অন্যদিকে আঞ্চলিক সংহতি রক্ষার তাগিদ—এই দুইয়ের মাঝে ভারসাম্য রক্ষা করা শিনবাউম প্রশাসনের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে ভেনেজুয়েলা ইস্যুতে মেক্সিকোর এই সংবেদনশীল ও সাহসী অবস্থান বিশ্বের অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শিনবাউম তার বক্তব্যের শেষ দিকে বিশ্ব নেতাদের প্রতি আহ্বান জানান যেন তারা শক্তির বদলে ন্যায়ের শাসন এবং পেশী শক্তির বদলে পারস্পরিক শ্রদ্ধার সংস্কৃতি গড়ে তোলেন। তিনি মনে করেন, একমাত্র সংলাপে বিশ্বাসী হয়েই বিশ্বকে আগামীর সংঘাত থেকে মুক্ত রাখা সম্ভব। ভেনেজুয়েলার জনগণের এই সংকটকালে তাদের পাশে থাকার এবং যেকোনো অন্যায় পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে তিনি তার বক্তব্য শেষ করেন।

