সোমবার (৫ জানুয়ারি ২০২৬) প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর চিফ অব স্টাফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়া’য়াল জামির আইডিএফের জন্য চার বছর মেয়াদী একটি বিশদ সামরিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। এই মহাপরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হচ্ছে ইরান, লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং পশ্চিম তীরের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে একই সময়ে সামরিক অভিযান পরিচালনা করার সক্ষমতা অর্জন করা। আধুনিক যুদ্ধকৌশলের অংশ হিসেবে এই প্রস্তুতিতে স্যাটেলাইটে হামলা এবং মহাকাশ থেকে ভূপৃষ্ঠের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার মতো উন্নত প্রযুক্তিগত বিষয়গুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
চ্যানেল ১২-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইসরায়েলের এই রণপ্রস্তুতির কেন্দ্রে রয়েছে ইরান। ইসরায়েলি নীতিনির্ধারকদের আশঙ্কা, ইরানে বর্তমানে চরম মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে যে গণবিক্ষোভ শুরু হয়েছে, তা থেকে সাধারণ মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘোরাতে তেহরান ইসরায়েলের ওপর বড় ধরনের হামলা চালাতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইরানের এই বিক্ষোভ নিয়ে ইসরায়েলি সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য না করলেও দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিক্ষোভকারীদের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন ব্যক্ত করেছে। এমনকি মোসাদ দাবি করেছে যে, ইরানের এই বিক্ষোভ সংগঠিত করার পেছনে তাদের বিশেষ ভূমিকা ছিল। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর বর্তমানে ইরান সরকার তাদের ইতিহাসের অন্যতম কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে, যেখানে বিক্ষোভকারীরা অনেক ক্ষেত্রে রাজতন্ত্র পুনর্বহালের দাবিও তুলছে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত শুক্রবার (২ জানুয়ারি ২০২৬) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প ইরান সরকারকে সরাসরি হুঁশিয়ারি প্রদান করেছেন। তিনি বলেন, “ইরানের সরকার যদি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর কঠোর দমন-পীড়ন চালায়, তবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে সামরিক অভিযান চালাতে দ্বিধা করবে না। এ জন্য যাবতীয় সামরিক প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে।”
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই ‘লকড অ্যান্ড লোডেড’ বা যুদ্ধের চূড়ান্ত প্রস্তুতির বার্তা ইরানকে এক কঠিন কূটনৈতিক চাপে ফেলেছে। এর আগে গত জুনে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার উত্তেজনার সময় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় সফল হামলা চালিয়েছিল বলে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন।
ইসরায়েলি জেনারেল ইয়া’য়াল জামিরের এই চার বছর মেয়াদী পরিকল্পনা কেবল স্থল যুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি আইডিএফের সক্ষমতাকে মহাকাশ পর্যন্ত বিস্তৃত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। ইসরায়েল মনে করে, আধুনিক যুদ্ধে প্রতিপক্ষের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করতে স্যাটেলাইট হামলা একটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হতে পারে। এছাড়া লেবানন সীমান্তে হিজবুল্লাহর ক্রমবর্ধমান হুমকি এবং পশ্চিম তীরের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সামাল দিতে আইডিএফকে একযোগে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের এই ঘোষণা মধ্যপ্রাচ্যে একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে। একদিকে ইরানের অভ্যন্তরীণ সংকট আর অন্যদিকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চাপ— সব মিলিয়ে অঞ্চলটি এখন এক বা অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়েছে। যদি পরিস্থিতি দ্রুত শান্ত না হয়, তবে এই বহুমুখী যুদ্ধের প্রস্তুতি বাস্তব সংঘাতের রূপ নিতে পারে, যার প্রভাব পড়বে পুরো বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনীতিতে।

