বাংলাদেশে কৃষির সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে আয়োজিত চার দিনব্যাপী এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা এবং কৃষি খাতের নীতি প্রণয়ন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রেখেছেন বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। শনিবার (২৯ নভেম্বর) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে বাংলাদেশ কৃষি সাংবাদিক ফোরাম (বিএজেএফ) আয়োজিত সম্মেলনের তৃতীয় দিনে ‘কৃষি ও খাদ্যে রাজনৈতিক অঙ্গীকার’ শীর্ষক এক অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি কৃষি পণ্যের মূল্য নির্ধারণে সরকারি হস্তক্ষেপের কঠোর সমালোচনা করেন এবং শস্য ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অঞ্চলভিত্তিক ম্যাপিংয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী তাঁর বক্তব্যে দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, বাজার অর্থনীতিতে কৃষি পণ্যের দাম নির্ধারণ করে দেওয়ার মাধ্যমে সরকারি প্রতিষ্ঠান একপ্রকার ‘বোকার কাজ করছে’। তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন যে, বাজারে স্বাভাবিক সরবরাহ ও চাহিদার ভিত্তিতেই মূল্য নির্ধারিত হওয়া উচিত। সরকারি হস্তক্ষেপের কারণে অনেক সময় কৃষক তার ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হন, আবার কখনো কখনো ভোক্তাকেও অযৌক্তিকভাবে বেশি দাম দিতে হয়, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে।
কৃষি খাতে বাংলাদেশের অর্জন স্বীকার করেও এই জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদ বলেন, যদিও আমরা কৃষিতে ব্যাপক উন্নতি সাধন করেছি, কিন্তু এটিকে এখনো ‘বিপ্লব’ বলা যায় না। কৃষি ক্ষেত্রে সত্যিকারের বিপ্লব ঘটাতে হলে রাজনৈতিক দূরদর্শিতা এবং সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন। এই প্রসঙ্গে তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্লোগান ‘উৎপাদনের রাজনীতি’র কথা উল্লেখ করেন, যার ফলশ্রুতিতে একসময় বাংলাদেশ চাল রপ্তানি করতে সক্ষম হয়েছিল। তিনি বলেন, কৃষির সর্বোচ্চ উৎপাদন নিশ্চিত করার জন্য সরকার, বেসরকারি খাত এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও)-গুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। বাংলাদেশের মাটি অত্যন্ত উর্বর এবং এই মাটিতে এমন অনেক কিছু উৎপাদন সম্ভব, যা আমরা এখনো করতে পারছি না। সম্মিলিত একটি ‘ঐক্যজোট’ (অ্যালায়েন্স) তৈরি করতে পারলেই কৃষি খাতে একটি সত্যিকারের বিপ্লব আনা সম্ভব।
আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর বক্তব্যের প্রধান কৌশলগত দিক ছিল কৃষির ‘অঞ্চলভিত্তিক ম্যাপিং’ (Region-based Mapping) করার অপরিহার্যতা। তিনি জোর দিয়ে বলেন, দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এটি অত্যন্ত জরুরি। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, বাংলাদেশের কৃষিতে কোন অঞ্চলে কোন ফসল উৎপাদন করা সর্বাধিক লাভজনক ও পরিবেশবান্ধব হবে, তার একটি সুনির্দিষ্ট মানচিত্র তৈরি করা দরকার।
এই ম্যাপিংয়ের উদ্দেশ্য হবে প্রতিটি অঞ্চলের অন্তর্নিহিত সম্ভাবনা খুঁজে বের করা। এর মাধ্যমে মাটির গুণাগুণ, জলবায়ু পরিবর্তন সহনশীলতা এবং স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী ফসল নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, ‘যেখানে যে সম্ভাবনা আছে, সেই সম্ভাবনা খুঁজে বের করবো এবং সেই অনুযায়ী অবকাঠামোর উন্নয়ন ঘটাবো।’ এই পদ্ধতি কৃষকের বিনিয়োগ ও পরিশ্রমকে সুরক্ষিত করবে, ফলন বাড়াবে এবং দেশের খাদ্য উৎপাদনে একটি সুশৃঙ্খল কৌশলগত ভিত্তি তৈরি করবে।
বিএনপি নেতা বলেন, কৃষি খাতের উন্নয়নের জন্য নীতি (Policy) কাগজে-কলমে থাকলেও, সেই নীতি বাস্তবায়নের মতো দক্ষ ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ মানুষের অভাব রয়েছে। অনেক ভালো সংস্কারমূলক উদ্যোগ নেওয়া হলেও কৃষক তার সুফল পান না। প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ কৃষকের উৎপাদিত ফসল প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণের অভাবে পচে নষ্ট হয়। এই অপচয় রোধ করতে হলে কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে ব্যাপক বিনিয়োগ এবং উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার অপরিহার্য।
তিনি সতর্ক করে দেন যে, খাদ্য আমদানি নির্ভরতা কমাতে না পারলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে বৈশ্বিক রাজনীতির শিকার হতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়লে বা ভূ-রাজনৈতিক কোনো কারণে সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হলে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলো মারাত্মক খাদ্য সংকটে পড়তে পারে। তাই অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানো এবং সংরক্ষণ সক্ষমতা বৃদ্ধি করা কেবল অর্থনৈতিক নয়, জাতীয় নিরাপত্তারও বিষয়।
আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী আরও উল্লেখ করেন যে, এখনো দেশের সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান হয় কৃষি খাতে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে কৃষি। বিএনপি ১৮ মাসের মধ্যে এক কোটি কর্মসংস্থানের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, তার অন্যতম প্রধান খাত এই কৃষি। ফলে, কৃষি বিপ্লব কেবল খাদ্য উৎপাদন বাড়াবে না, বরং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়ক হবে।
সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আহসান খান চৌধুরী। তিনি আমীর খসরুর বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, কৃষিতে ব্যাপক পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে, অন্যথায় দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। তিনি বিশেষ করে মাছ ও মুরগি উৎপাদন এবং উদ্যানপালন (হর্টিকালচার) খাতে উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর দেন।
আহসান খান চৌধুরী উদ্যানপালনে উৎপাদনের দক্ষতা বাড়াতে চীনের মতো দেশের সহায়তা নেওয়ার বিষয়ে পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে যতো ধরনের পরামর্শ আছে, তা সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে গ্রহণ করতে হবে এবং সেই অনুযায়ী কাজ করতে হবে। তিনি বেসরকারি উদ্যোক্তা হিসেবে বলেন, ব্যবসায়ীরা অবশ্যই ব্যবসা করবেন, তবে কেনা-বেচার ক্ষেত্রে পরিমিত লাভ করে বাজারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হবে।
বিএজেএফ সভাপতি সাহানোয়ার সাইদ শাহীনের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক আবু খালিদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এই অধিবেশনে বক্তারা একমত হন যে, বাংলাদেশের কৃষি খাত বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে বাজারের স্বাধীনতা, অঞ্চলভিত্তিক বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং সরকারের সঙ্গে বেসরকারি খাতের শক্তিশালী সমন্বয় অপরিহার্য। এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনটি কৃষি সাংবাদিকতা এবং নীতিনির্ধারকদের মধ্যে একটি ফলপ্রসূ সংলাপের সূচনা করল, যা ভবিষ্যতে কৃষি নীতির কাঠামো নির্ধারণে সহায়ক হতে পারে।

