দক্ষিণ আমেরিকার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত দেশ ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস এক চরম আতঙ্ক ও অস্থিরতার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করছে। স্থানীয় সময় শুক্রবার গভীর রাত থেকে শুরু হওয়া একের পর এক শক্তিশালী বিস্ফোরণ এবং আকাশপথে বোমারু বিমানের প্রচণ্ড গর্জনে প্রকম্পিত হয়ে উঠেছে গোটা রাজধানী শহর। বিশেষ করে শহরের দক্ষিণ অংশে অবস্থিত দেশটির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর সামরিক ঘাঁটি ‘ফরচুনা’-তে এই বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাগুলো ঘটেছে। প্রত্যক্ষদর্শী ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সামরিক ঘাঁটির ভেতর থেকে আগুনের লেলিহান শিখা এবং কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী আকাশে ছড়িয়ে পড়তে দেখা গেছে, যা পুরো এলাকায় এক যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।
ভেনেজুয়েলার প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই ফরচুনা ঘাঁটিটি দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা ও সামরিক সক্ষমতার প্রতীক। আল জাজিরার প্রতিবেদক লুসিয়া নিউম্যানের দেওয়া তথ্য অনুসারে, শুক্রবার শেষ রাত থেকে শুরু হয়ে আজ শনিবার ভোর পর্যন্ত এই সিরিজ বিস্ফোরণ অব্যাহত ছিল। এই আকস্মিক ও ভয়াবহ ঘটনার পরপরই ফরচুনা ঘাঁটি এবং তার পার্শ্ববর্তী বিস্তীর্ণ আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতে বিদ্যুৎ সংযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। অন্ধকারের মধ্যে বিস্ফোরণের শব্দে আতঙ্কিত বাসিন্দারা দিকবিদিক ছোটাছুটি শুরু করেন। যদিও এখন পর্যন্ত এই ঘটনায় হতাহতের সঠিক কোনো সংখ্যা বা ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ সরকারিভাবে প্রকাশ করা হয়নি, তবে ঘটনাস্থলের দৃশ্যপট থেকে এটি স্পষ্ট যে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ব্যাপক হতে পারে।
এই সিরিজ বিস্ফোরণের কারণ নিয়ে বর্তমানে বিশ্বজুড়ে নানা জল্পনা ও বিশ্লেষণ চলছে। তবে ভেনেজুয়েলার সরকার বা সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রদান করা হয়নি। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা দুটি প্রধান সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করছেন। একটি অংশ মনে করছে, ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ সামরিক কর্মকর্তাদের একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে পরিকল্পিতভাবে এই নাশকতা চালিয়ে থাকতে পারে। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক মন্দা এবং রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে সেনাবাহিনীর একটি অংশের মধ্যে অসন্তোষ দানা বেঁধেছে বলে অনেক দিন ধরেই গুঞ্জন ছিল। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক কঠোর অবস্থান এবং মেক্সিকো সীমান্তে ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তজনা বিবেচনায় নিয়ে অনেকে একে বিদেশি হস্তক্ষেপ বা বিশেষ অভিযানের অংশ হিসেবেও সন্দেহ করছেন।
কারাকাসে বিস্ফোরণ ও উত্তজনা শুরুর পরপরই আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বা পেন্টাগনের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে। তবে উদ্ভূত পরিস্থিতি সম্পর্কে পেন্টাগনের কোনো কর্মকর্তা মন্তব্য করতে রাজি হননি। ওয়াশিংটনের এই নীরবতা ঘটনার গভীরতা ও রহস্যকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত কয়েক সপ্তাহে ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক সংকট নিরসনে বারবার কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। গত ২৯ ডিসেম্বর এক ভাষণে ট্রাম্প সরাসরি বলেছিলেন যে, তিনি চান প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো স্বেচ্ছায় ক্ষমতা হস্তান্তর করে দেশত্যাগ করুন। অন্যথায় কঠিন পরিণতি বরণ করতে হবে বলেও তিনি সতর্ক করেছিলেন। ট্রাম্পের এই ধরনের সরাসরি হুমকি এবং তার কয়েক দিনের মাথায় দেশটির প্রধান সামরিক ঘাঁটিতে এ ধরনের বিস্ফোরণ স্বাভাবিকভাবেই জনমনে অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর সাথে হোয়াইট হাউসের বৈরিতা নতুন কিছু নয়। ২০১৭ সালে ট্রাম্প যখন প্রথমবার ক্ষমতায় এসেছিলেন, তখন থেকেই তিনি মাদুরো প্রশাসনকে অবৈধ ও একনায়কতান্ত্রিক হিসেবে আখ্যায়িত করে আসছিলেন। ২০২৫ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার ওপর চাপের মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছেন। বিশেষ করে ভেনেজুয়েলার অর্থনীতির প্রাণশক্তি হিসেবে পরিচিত তেল খাতের ওপর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন গত ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে ঘোষণা করেছিল যে, ভেনেজুয়েলার তেলবাহী ট্যাংকার জাহাজগুলোর ওপর সর্বাত্মক অবরোধ জারি করা হবে। মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে বলা হয়েছিল, নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা কোনো জাহাজ ভেনেজুয়েলার বন্দরে প্রবেশ করলে বা ছেড়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে সেগুলোকে তাৎক্ষণিকভাবে জব্দ করা হবে।
বাস্তব ক্ষেত্রেও দেখা গেছে যুক্তরাষ্ট্রের এই কঠোর অবস্থানের প্রতিফলন। গত ডিসেম্বর মাসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ভেনেজুয়েলার অন্তত চারটি তেলবাহী ট্যাংকার জাহাজ আন্তর্জাতিক জলসীমা থেকে জব্দ করেছে মার্কিন নৌবাহিনী। এই জাহাজগুলো মূলত ভেনেজুয়েলার সরকারি কোষাগারের অর্থের প্রধান উৎস তেল রপ্তানির কাজে নিয়োজিত ছিল। এই ধরনের অর্থনৈতিক ও নৌ-অবরোধ ভেনেজুয়েলার বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে আরও খাদের কিনারে ঠেলে দিয়েছে। মাদুরো প্রশাসন বারবার এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং সার্বভৌম রাষ্ট্রের ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করলেও ওয়াশিংটন তাদের অবস্থানে অনড় রয়েছে।
কারাকাসের এই বর্তমান অস্থিতিশীলতা কেবল ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়, বরং এটি সমগ্র লাতিন আমেরিকার আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফরচুনা সামরিক ঘাঁটিতে বিস্ফোরণের ঘটনাটি যদি সত্যিই অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহের অংশ হয়, তবে তা দেশটিতে গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা উসকে দিতে পারে। আবার এটি যদি বহিঃশক্তির কোনো গুপ্ত অভিযান হয়ে থাকে, তবে তা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক চরম অস্থিরতা সৃষ্টি করবে। ভেনেজুয়েলার সাধারণ মানুষ, যারা ইতিমধ্যেই খাদ্য ও ওষুধের সংকটে মানবেতর জীবন যাপন করছেন, তারা এখন এক অজানা আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন। রাজধানীর অধিকাংশ দোকানপাট ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং রাস্তায় টহল দিচ্ছে সাঁজোয়া যান।
বিশ্লেষকদের মতে, কারাকাসের এই বিস্ফোরণগুলো নিকোলাস মাদুরোর শাসনের জন্য একটি চরম পরীক্ষা হতে পারে। একদিকে মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা, অন্যদিকে সামরিক বাহিনীর ভেতরে সম্ভাব্য ফাটল—সব মিলিয়ে মাদুরোর ক্ষমতা ধরে রাখা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে। বর্তমান পরিস্থিতির ওপর গভীর নজর রাখছে রাশিয়া ও চীনের মতো দেশগুলোও, যারা ঐতিহাসিকভাবে মাদুরো সরকারের মিত্র হিসেবে পরিচিত। এখন দেখার বিষয়, ভেনেজুয়েলা সরকার এই সংকটের কী ব্যাখ্যা দেয় এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখায়। তবে আপাতত ধ্বংসস্তূপ ও ধোঁয়ার কুণ্ডলীর নিচে ঢাকা পড়েছে কারাকাসের স্বাভাবিক জনজীবন, আর আকাশে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে বোমারু বিমানের গর্জন যা এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

