ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি হস্তক্ষেপের হুমকির বিপরীতে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে তেহরান। শুক্রবার ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব আলি লারিজানি এক বিবৃতিতে বলেন, ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো ধরনের হস্তক্ষেপ কেবল এ অঞ্চলকেই অস্থিতিশীল করবে না, বরং খোদ আমেরিকার স্বার্থের জন্যও তা চরম বিপর্যয়কর হবে। ট্রাম্পের মন্তব্যের কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে তিনি বলেন, তেহরান এই ধরনের যেকোনো ‘অ্যাডভেঞ্চারের’ দাঁতভাঙা জবাব দিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
এর আগে, শুক্রবার নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান সরকারকে নজিরবিহীন এক আল্টিমেটাম প্রদান করেন। ট্রাম্প লেখেন, “ইরান যদি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালায় এবং সহিংসভাবে হত্যা করে—যা তাদের পুরনো অভ্যাস—তাহলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের উদ্ধারে এগিয়ে আসবে। আমরা সম্পূর্ণ প্রস্তুত (Locked and Loaded) এবং যেকোনো সময় পদক্ষেপ নিতে পারি।” ট্রাম্পের এই আক্রমণাত্মক বার্তা এবং ‘উদ্ধারে আসা’র প্রতিশ্রুতিকে সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে দেখছে ইরান।
আলি লারিজানি ট্রাম্পের এই হুমকির জবাবে আরও বলেন, মার্কিন প্রশাসনের বোঝা উচিত যে ইরান তার অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভকারী এবং ‘বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী’দের মধ্যে পার্থক্য করতে জানে। তিনি অভিযোগ করেন, ইসরায়েল এবং ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলো প্রমাণ করে যে ইরানের চলমান অস্থিরতার পেছনে বিদেশি শক্তির সুদূরপ্রসারী নীল নকশা রয়েছে। লারিজানি মার্কিন জনগণের উদ্দেশে বলেন, “ট্রাম্প যে বিপজ্জনক খেলা শুরু করেছেন, তাতে আপনাদের সৈন্যদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করা উচিত।”
উল্লেখ্য, গত কয়েক দশকের মধ্যে ইরানে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং মুদ্রার নজিরবিহীন দরপতনের প্রতিবাদে গত রবিবার থেকে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ এখন ষষ্ঠ দিনে পদার্পণ করেছে। রাজধানী তেহরান ছাড়িয়ে ইসফাহান, লরেস্তান, মাজানদারান এবং খুজেস্তানসহ অন্তত এক ডজন বড় শহরে ছড়িয়ে পড়েছে এই আন্দোলন। বিক্ষোভকারীরা কেবল অর্থনৈতিক সংস্কার নয়, বরং বর্তমান শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন এবং সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনীর পদত্যাগের দাবিতেও স্লোগান দিচ্ছেন।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো এবং স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী, নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে সংঘর্ষে এ পর্যন্ত অন্তত ৭ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন এবং কয়েকশ মানুষকে আটক করা হয়েছে। ইরানের পশ্চিমাঞ্চলীয় কুহদাশত এবং লর্ডেগান এলাকায় পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি উত্তপ্ত বলে জানা গেছে। বিক্ষোভকারীরা বেশ কিছু সরকারি ভবন ও বাসিজ (আধা-সামরিক বাহিনী) দপ্তরে অগ্নিসংযোগ করেছেন বলেও অসমর্থিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ২০২৬ সালের এই শুরুটা মধ্যপ্রাচ্যের জন্য এক চরম উত্তেজনার বার্তা নিয়ে এসেছে। একদিকে ইরানের অভ্যন্তরে তীব্র জনঅসন্তোষ, অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘লকড অ্যান্ড লোডেড’ অবস্থানের কারণে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে ছায়া যুদ্ধের অবসান ঘটে সরাসরি সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে ইরান সরকার বলছে, তারা বহিরাগতদের উস্কানি উপেক্ষা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম। শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটন এবং তেহরানের এই বাকযুদ্ধ কোনো বড় সংঘাতের দিকে মোড় নেয় কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

