দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক মঞ্চে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার সম্পর্কে জমে থাকা বরফ গলার যে ক্ষীণ আভাস পাওয়া গিয়েছিল, তা আবারও ফিকে হয়ে পড়েছে। ঢাকায় পাকিস্তানি স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিকের সঙ্গে সৌজন্যমূলক করমর্দনের মাত্র দুই দিন পরই সুর পাল্টেছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। পাকিস্তানকে একটি ‘ক্ষতিকর প্রতিবেশী’ হিসেবে অভিহিত করে তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, সন্ত্রাসবাদের হাত থেকে নিজেদের জনগণকে রক্ষা করার পূর্ণ অধিকার ভারতের রয়েছে এবং প্রয়োজনে ভারত সেই অধিকার কঠোরভাবে প্রয়োগ করবে।
শুক্রবার (২ জানুয়ারি) ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (আইআইটি) মাদ্রাজ আয়োজিত একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে বক্তব্য প্রদানকালে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রতিবেশী দেশটির বিরুদ্ধে অত্যন্ত কড়া অবস্থান ব্যক্ত করেন। পাকিস্তানের নাম সরাসরি উল্লেখ না করলেও তাঁর ইঙ্গিত ছিল স্পষ্ট। তিনি বলেন, “কারো কপালে দুর্ভাগ্যবশত খারাপ প্রতিবেশী থাকতে পারে। আমাদের ক্ষেত্রেও তা-ই ঘটেছে। যখন পশ্চিম দিকের কোনো দেশ (পাকিস্তান) সুচিন্তিতভাবে, বিরতিহীনভাবে এবং কোনো অনুশোচনা ছাড়াই সন্ত্রাসবাদকে নীতি হিসেবে গ্রহণ করে, তখন আমাদের জনগণের জানমাল রক্ষায় পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া কোনো পথ থাকে না।”
জয়শঙ্কর আরও যোগ করেন যে, এই অধিকার ভারত কীভাবে এবং কখন প্রয়োগ করবে, তা সম্পূর্ণ ভারতের নিজস্ব সিদ্ধান্তের বিষয়। এ ক্ষেত্রে বাইরের কারো পরামর্শ বা হস্তক্ষেপ নয়াদিল্লি মেনে নেবে না। তিনি দৃঢ়কণ্ঠে বলেন, “নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে যা করা প্রয়োজন, ভারত তা-ই করবে। আমাদের কী করা উচিত আর কী করা উচিত নয়, তা অন্য কেউ বলে দেওয়ার অধিকার রাখে না।”
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার বর্তমান তিক্ততার মূলে রয়েছে গত বছরের এপ্রিল মাসে ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু ও কাশ্মীরের পেহেলগামে সংঘটিত এক ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা। সেই ঘটনায় ২৬ জন পর্যটকের মৃত্যু হলে ভারত এর দায় সরাসরি পাকিস্তানের ওপর চাপায়। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৭ মে ভোরে ভারত পাকিস্তানে মিসাইল হামলা চালায়, যার পাল্টা জবাব দেয় ইসলামাবাদও। দুই দেশের মধ্যে সেই সময় চার দিনব্যাপী যে রক্তক্ষয়ী সীমান্ত সংঘর্ষ হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় থামলেও সম্পর্কের অবনতি ঘটে চরমে।
সেই সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ভারত ১৯৬০ সালে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক ‘সিন্ধু নদ পানিবণ্টন চুক্তি’ বাতিলের যে প্রক্রিয়া শুরু করেছে, আজ মাদ্রাজ আইআইটির অনুষ্ঠানে তার পক্ষেও জোরালো সাফাই গান জয়শঙ্কর। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “একটি দেশ কয়েক দশক ধরে আপনার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদ চালিয়ে যাবে, প্রতিবেশীসুলভ কোনো আচরণ করবে না, অথচ আপনি তাদের সঙ্গে পানি ভাগ করে নেবেন—এভাবে দ্বিমুখী নীতি চলতে পারে না। একদিকে সন্ত্রাসবাদ আর অন্যদিকে পানি ভাগাভাগি বা সহযোগিতা—এই দুটি বিষয় কখনো একসাথে সমন্বয় করা সম্ভব নয়।”
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই কঠোর বক্তব্য পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যকার সাম্প্রতিক ‘ট্র্যাক-টু’ ডিপ্লোম্যাসি বা পর্দার অন্তরালে থাকা কূটনৈতিক উদ্যোগের ওপর বড় ধরনের ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। জয়শঙ্করের মতে, প্রতিবেশী যদি বন্ধুভাবাপন্ন হয় তবে ভারত সব সময় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে প্রস্তুত থাকে। কিন্তু প্রতিবেশী যখন ক্ষতিকর হয়ে ওঠে, তখন জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করাই ভারতের প্রধান অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়ায়। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভারতের এই অনড় অবস্থান আগামী দিনে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক রাজনীতিতে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।

