রাজধানী ঢাকার মোহাম্মদপুরস্থ জেনেভা ক্যাম্প, যা দীর্ঘদিন ধরেই মাদক চোরাচালান ও অপরাধ জগতের অন্যতম অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত, সেখানে ফের রক্তাক্ত সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। শনিবার (২৯ নভেম্বর) সন্ধ্যার পর ক্যাম্পের অভ্যন্তরে মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে শীর্ষ মাদক কারবারি বুনিয়া সোহেলের ওপর এক নৃশংস ও প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা ঘটে। প্রতিপক্ষ গ্রুপের সন্ত্রাসীরা তাকে ঘিরে ধরে গণপিটুনি দেওয়ার পাশাপাশি ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করেছে। মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে, যেখানে তিনি মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। এই ঘটনায় গোটা ক্যাম্প এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, জেনেভা ক্যাম্পে মাদক ব্যবসার একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই একাধিক গ্রুপের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ ও প্রত্যক্ষ সংঘাত চলে আসছিল। বিশেষ করে শীর্ষ মাদক কারবারি বুনিয়া সোহেল গ্রুপ এবং অপর একটি শক্তিশালী পক্ষ পিচ্চি রাজা গ্রুপের মধ্যে এই দ্বন্দ্ব ছিল তুঙ্গে। শনিবারের এই হামলাটি ছিল সেই দীর্ঘস্থায়ী বিরোধের এক ভয়াবহ বহিঃপ্রকাশ। বিগত দিনগুলোতে এই দুই পক্ষের মধ্যে একাধিকবার গোলাগুলি, ককটেল বিস্ফোরণ এবং হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটেছে, যার ফলে ক্যাম্পের সাধারণ বাসিন্দারা জিম্মি দশায় দিন কাটাচ্ছিলেন। তবে এবারের ঘটনাটি অতীতের সব সহিংসতাকে ছাপিয়ে গেছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
ঘটনার সূত্রপাত সম্পর্কে অনুসন্ধানে জানা যায়, সম্প্রতি বুনিয়া সোহেলের অন্যতম শক্তি হিসেবে পরিচিত তার ভাই টুনটুন এবং ঘনিষ্ঠ সহযোগী এসকে নাসিম আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন। প্রধান দুই সহযোগীর আটকের ঘটনায় বুনিয়া সোহেল সাংগঠনিকভাবে অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েন। আর এই সুযোগটিই পুরোপুরি কাজে লাগায় তার প্রতিপক্ষরা। ক্যাম্পের ৪ নম্বর সেক্টরের মাদক কারবারিরা সংঘবদ্ধ হয়ে শনিবার সন্ধ্যায় তার ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। হামলার সময় সন্ত্রাসীরা তাকে একা পেয়ে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে। একইসঙ্গে চলে নির্মম গণপিটুনি।
হামলার ভয়াবহতা সম্পর্কে স্থানীয় একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, এই নৃশংসতার পেছনে সরাসরি জড়িত ছিল চুয়া সেলিম, পিচ্চি রাজা, পাড় মনু, শাহ আলম, ইমতিয়াজ, লালন, রনি, তারেক, মাওরা রাসেল, টুকি, সামির, বিকি, ফেরদৌস, নেতা সামির, চেম্বার রাজ, সুমন, আদিল, ফাইজান, নওশাদ ও বেলুনসহ আরও বেশ কয়েকজন চিহ্নিত অপরাধী। অভিযোগ রয়েছে, এই পুরো ঘটনার নেপথ্যে ইন্ধন যুগিয়েছেন শীর্ষ হেরোইন সরবরাহকারী আরিফ, যিনি অপরাধ জগতে ‘চাপা আরিফ’ নামেই অধিক পরিচিত। মূলত, বুনিয়া সোহেলকে সরিয়ে জেনেভা ক্যাম্পের মাদক বাণিজ্যের পুরো নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়াই ছিল এই হামলার মূল উদ্দেশ্য।
পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল যে, ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ ও সেনাবাহিনী দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও তাদের উদ্ধারকাজে বাধার সম্মুখীন হতে হয়। ৪ নম্বর সেক্টরের মাদক কারবারিরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর চড়াও হওয়ার চেষ্টা করে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। তবে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করে এবং রক্তাক্ত অবস্থায় বুনিয়া সোহেলকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। তাকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসকদের মতে, তার শরীরে ধারালো অস্ত্রের একাধিক গভীর আঘাতের চিহ্ন রয়েছে এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে তার অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।
এ বিষয়ে তেজগাঁও বিভাগের মোহাম্মদপুর জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন গণমাধ্যমকে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, সন্ধ্যা সাতটার দিকে তারা খবর পান যে জেনেভা ক্যাম্পের ৪ নম্বর সেক্টরে এক ব্যক্তিকে আটকে রেখে মারধর ও কোপানো হচ্ছে। তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর একটি যৌথ দল সেখানে অভিযান চালায় এবং গুরুতর আহত অবস্থায় বুনিয়া সোহেলকে উদ্ধার করে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, উদ্ধারের সময় সোহেলের অবস্থা ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। তার শরীরে ধারালো অস্ত্রের আঘাত ও নির্মম প্রহারের চিহ্ন স্পষ্ট।
সহকারী পুলিশ কমিশনার আরও বলেন, কারা তাকে ধরে এনে এমন নৃশংসভাবে জখম করেছে, সে বিষয়ে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। যদিও স্থানীয়ভাবে বেশ কিছু নাম উঠে এসেছে, তবুও আহত বুনিয়া সোহেলের জ্ঞান ফিরলে এবং তার জবানবন্দি গ্রহণ করা সম্ভব হলে ঘটনার প্রকৃত রহস্য ও জড়িতদের পরিচয় আরও স্পষ্টভাবে জানা যাবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বর্তমানে ক্যাম্পের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করছে এবং জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রেখেছে।
জেনেভা ক্যাম্পের এই ঘটনা রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য একটি অশনিসংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। ঘনবসতিপূর্ণ এই ক্যাম্পে মাদক কারবারিদের দৌরাত্ম্য বন্ধে প্রশাসন বারবার উদ্যোগ নিলেও, অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বে প্রায়শই এমন রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, মাদক ব্যবসার এই সিন্ডিকেটগুলো এতটাই শক্তিশালী যে, তারা একে অপরকে নির্মূল করতে দ্বিধা করে না। বুনিয়া সোহেলের ওপর এই হামলার পর প্রতিপক্ষ গ্রুপটি ক্যাম্পের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের সংঘাতের জন্ম দিতে পারে।
হাসপাতাল সূত্রে সর্বশেষ পাওয়া খবরে জানা গেছে, বুনিয়া সোহেলের চিকিৎসার জন্য একটি বিশেষ মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হতে পারে। তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) স্থানান্তরের প্রয়োজন হতে পারে। এদিকে, জেনেভা ক্যাম্পের পরিস্থিতি বর্তমানে থমথমে। যেকোনো মুহূর্তে আবারও সংঘর্ষের আশঙ্কায় সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত। পুলিশ ও সেনাবাহিনীর টহল জোরদার করা হয়েছে যাতে নতুন করে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে।
মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের মধ্যেও রাজধানীর বুকে এমন প্রকাশ্য নৃশংসতা জনমনে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, শুধু অভিযান চালিয়ে নয়, বরং সামাজিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং ক্যাম্পের অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেটগুলোকে পুরোপুরি ভেঙে দিতে না পারলে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা কঠিন হবে। বুনিয়া সোহেলের ওপর হামলার ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করল যে, মাদকের কালো টাকা ও ক্ষমতার লোভ মানুষকে কতটা নৃশংস করে তুলতে পারে। প্রশাসন এখন এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে কতটা সফল হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

