বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় সাধারণ মানুষের অভূতপূর্ব অংশগ্রহণকে তাঁর প্রতি দেশবাসীর গভীর মমতা ও অকৃত্রিম ভালোবাসার প্রতিফলন হিসেবে বর্ণনা করেছেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এই মন্তব্য করেন। সদ্য প্রয়াত এই নেত্রীর জানাজায় অংশ নেওয়া বিপুল জনস্রোত এবং মানুষের আবেগঘন উপস্থিতিকে তিনি বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক অনন্য নজির হিসেবে উল্লেখ করেন।
গত কয়েকদিনের শোকাতুর পরিস্থিতির মধ্যে আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় যে বিপুল জনসমাগম দেখা গেছে, তা কেবল একটি রাজনৈতিক জমায়েত নয়, বরং এটি ছিল একজন নেত্রীর প্রতি দেশের মানুষের হৃদয়ের টানের বহিঃপ্রকাশ। অনেক মানুষকে বাড়ির ছাদ থেকে এবং দূর-দূরান্ত থেকে এসে জানাজায় শরিক হতে দেখা গেছে।
সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে এই বিপুল ভালোবাসার পেছনের কারণ জানতে চাওয়া হলে বিএনপি মহাসচিব আবেগাপ্লুত কণ্ঠে জানান, বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতির এক বিরল এবং আপসহীন ব্যক্তিত্ব। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং গণতন্ত্র রক্ষার সংগ্রামে তিনি কখনোই নিজের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি বহু প্রতিকূলতা ও কারাবরণ সহ্য করেছেন, কিন্তু জনগণের অধিকার আদায়ে সব সময় সোচ্চার ছিলেন।
মির্জা ফখরুল আরও উল্লেখ করেন যে, বেগম খালেদা জিয়া অত্যন্ত অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও কখনো নিজের জন্মভূমি ছেড়ে অন্য কোথাও যাওয়ার কথা ভাবেননি। দেশের প্রতি তাঁর এই গভীর টান এবং মাটির মায়ার কারণেই আজ সাধারণ মানুষ তাঁকে হারানোর বেদনায় মুহ্যমান। তিনি বলেন, দেশের বর্তমান এই কঠিন সময়ে যখন একজন অভিজ্ঞ অভিভাবকের প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি ছিল, ঠিক তখনই তাঁর প্রস্থান জাতিকে শোকস্তব্ধ করে দিয়েছে।
জানাজায় সমবেত মানুষের চোখের পানি এবং বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনায় করা প্রার্থনা প্রমাণ করে যে, তিনি মানুষের হৃদয়ে কতটা স্থায়ী আসন করে নিয়েছিলেন। বিএনপি মহাসচিবের মতে, এই শোকাতুর জনতা কেবল জানাজায় অংশ নিতে আসেনি, বরং তারা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের শপথ নিয়ে বাড়ি ফিরেছে।
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল জানান, বাবা, মা ও ভাইকে হারিয়ে তারেক রহমান এখন এক কঠিন সময় পার করছেন। তবে এই শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে দেশনেত্রীর রেখে যাওয়া আদর্শ ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের দর্শনকে সমুন্নত রাখার দায়িত্ব এখন তাঁর এবং দলের প্রতিটি স্তরের নেতা-কর্মীর ওপর বর্তেছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যে দর্শনের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, খালেদা জিয়া তা চার দশক ধরে সাহসের সঙ্গে ধারণ করেছেন। সেই একই পতাকা হাতে নিয়ে তারেক রহমান জনগণের পাশে থেকে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাবেন বলে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
আগামী জাতীয় নির্বাচনে খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতি দলের ওপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উত্তর দেন। তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার শারীরিক অনুপস্থিতি থাকলেও তাঁর আদর্শ ও তাঁর প্রতি মানুষের এই অদম্য আবেগ দলকে আরও বেশি শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ করবে। মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত ভালোবাসা আগামী দিনে একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের শক্তি হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে বিজয়ী করতে অনুপ্রেরণা জোগাবে।
সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর বিদায়ে সারা দেশে যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে, তা আন্তর্জাতিক মহলেও বেশ আলোচিত হচ্ছে। বিএনপি মহাসচিবের এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয় যে, দল এখন খালেদা জিয়ার স্মৃতি ও আদর্শকে পুঁজি করে এক নতুন রাজনৈতিক পথচলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। মানুষের এই বিপুল সমর্থন ও সহমর্মিতাকে রাজনৈতিক সম্পদে রূপান্তর করাই এখন দলটির প্রধান লক্ষ্য। শোকের এই আবহ কাটিয়ে উঠে কীভাবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নিজেদের অবস্থান সুসংহত করা যায়, সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নেই বিএনপি এখন মনোনিবেশ করছে।

