নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আকাশচুম্বী মূল্যবৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার লাগামহীন ব্যয়ের প্রতিবাদে ইরানে শুরু হওয়া বিক্ষোভ রক্তক্ষয়ী রূপ ধারণ করেছে। নতুন বছরের প্রথম দিনে দেশটির বিভিন্ন প্রান্তে বিক্ষোভকারীদের সাথে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষে অন্তত তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। রাজধানী তেহরান থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে, যা দেশটির সরকারকে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম রয়টার্স ও এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকালে দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানের লোরদেগান শহরে পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ হয়। আধা-সরকারি বার্তাসংস্থা ফার্স নিউজ জানিয়েছে, উত্তেজিত জনতা সরকারি ভবন, ব্যাংক ও মসজিদে হামলা চালালে নিরাপত্তা বাহিনী পাল্টা ব্যবস্থা নেয়। এই সংঘর্ষে দুই বিক্ষোভকারীর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
এর আগে বুধবার রাতে পশ্চিমাঞ্চলীয় লোরেস্তান প্রদেশের কুহদাশতে বাসিজ (বিপ্লবী গার্ড সংশ্লিষ্ট আধাসামরিক বাহিনী) এর এক সদস্য নিহত হন। নিরাপত্তা বাহিনীর এই সদস্যের নাম আমিরহোসাম খোদায়ারি বলে নিশ্চিত করেছে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। এছাড়া সংঘর্ষে আরও অন্তত ১৩ জন আহত হয়েছেন। মানবাধিকার সংস্থা ‘হেঙ্গো’ দাবি করেছে যে, ইসফাহান ও অন্যান্য প্রদেশেও নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে বিক্ষোভকারীরা হতাহত হয়েছেন এবং শত শত মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ইরানের এই গণঅসন্তোষের মূল কারণ হিসেবে কাজ করছে দেশটির নড়বড়ে অর্থনীতি। বর্তমানে ইরানে মূল্যস্ফীতি ৫০ শতাংশের ঘর ছুঁয়েছে, বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে ৭০ শতাংশের বেশি। গত এক বছরে মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়াল তার মূল্যের এক-তৃতীয়াংশ হারিয়েছে। বর্তমানে এক ডলারের বিনিময় হার ১৪ লাখ রিয়াল ছাড়িয়ে গেছে, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে ধ্বংস করে দিয়েছে।
গত রোববার তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারের ব্যবসায়ীরা দোকানপাট বন্ধ রেখে প্রথম এই বিক্ষোভ শুরু করেন। তারা অভিযোগ করেন, মুদ্রার এই দ্রুত দরপতনের ফলে ব্যবসা চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। পরে এই আন্দোলনে শিক্ষার্থী এবং সাধারণ শ্রমজীবীরাও যোগ দিলে তা রাজনৈতিক রূপ নেয়। বিক্ষোভকারীদের কণ্ঠে এখন ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক’ এবং ‘জনগণের জীবন নিয়ে খেলা বন্ধ করো’—এমন স্লোগান শোনা যাচ্ছে।
বিক্ষোভের ভয়াবহতা আঁচ করতে পেরে ইরান সরকার পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করছে। সরকারি মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন, সরকার বিক্ষোভকারীদের উদ্বেগের বিষয়ে অবগত এবং ট্রেড ইউনিয়ন ও ব্যবসায়ী নেতাদের সাথে সরাসরি সংলাপে বসতে রাজি। তিনি আরও বলেন, “মানুষের ওপর চাপ যখন বেশি হয়, তখন তাদের কণ্ঠস্বর উঁচু হওয়া স্বাভাবিক। সরকার শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকারকে সম্মান করে।”
অন্যদিকে, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পরিবর্তন করেছেন এবং কর্মকর্তাদের বিক্ষোভকারীদের ‘ন্যায্য দাবি’ শোনার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে ইরানের প্রসিকিউটর জেনারেল মোহাম্মদ মোভাহেদি-আজাদ হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ বৈধ হলেও অরাজকতা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে ‘কঠোর ব্যবস্থা’ নেওয়া হবে।
ইরানের এই অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের আরোপিত নিষেধাজ্ঞাকে দায়ী করছে তেহরান। গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করার পর দেশটির রিয়ালের মান আরও মুখ থুবড়ে পড়ে। এদিকে, ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিক্ষোভকারীদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে রাস্তায় নেমে আসার আহ্বান জানিয়েছে, যা ইরান সরকারের মাঝে বিদেশি হস্তক্ষেপের আশঙ্কা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বিক্ষোভের পর ইরানে এটাই সবচেয়ে বড় অস্থিরতা বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক দুর্দশা লাঘবে সরকার যদি দ্রুত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে না পারে, তবে এই আন্দোলন দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের দিকে মোড় নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

