বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-র চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণে দেশব্যাপী চলমান শোকের আবহকে জাতীয় শক্তিতে রূপান্তরের ঘোষণা দিয়েছে দলটি। বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে প্রয়াত নেত্রীর কবর জিয়ারত শেষে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের কাছে এই প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে সৃষ্ট যে গভীর শূন্যতা ও শোক আজ জাতির হৃদয়ে বিরাজ করছে, সেই শোককেই শক্তিতে পরিণত করে একটি গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে বিএনপি অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।
দীর্ঘ অসুস্থতার পর মঙ্গলবার ভোরে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন আপসহীন নেত্রী হিসেবে পরিচিত বেগম খালেদা জিয়া। তার এই আকস্মিক বিদায়ে সারা দেশে শোকের ছায়া নেমে আসে। আজ নববর্ষের প্রথম দিনে দলের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ তার কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন ও দোয়া মোনাজাত করতে উপস্থিত হন। জিয়ারত শেষে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বেগম খালেদা জিয়া আজীবন গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করেছেন। তার রাজনৈতিক জীবনের প্রধান শিক্ষা ছিল জনগণের অধিকার রক্ষা। সেই আদর্শকে পাথেয় করেই দল এখন আগামীর পথে এগিয়ে যাবে। শোকের এই কঠিন মুহূর্তে দলের তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ এবং তারা বেগম জিয়ার অসম্পূর্ণ স্বপ্ন বাস্তবায়নে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
প্রয়াতের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার কথা স্মরণ করে সালাহউদ্দিন আহমদ আরও উল্লেখ করেন যে, দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরাসরি অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। তিনি ফেনী-১, দিনাজপুর-৩ এবং বগুড়া-৭ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য দলীয় মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। নির্বাচনকে সামনে রেখে তার এই সক্রিয় প্রত্যাবর্তন তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মাঝে বিপুল উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছিল। যদিও নিয়তির অমোঘ বিধানে তিনি নির্বাচনের ময়দানে সশরীরে উপস্থিত হতে পারলেন না, তবে তার আদর্শ ও দিকনির্দেশনা প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় ধানের শীষের প্রচারণায় মূল শক্তি হিসেবে কাজ করবে।
নির্বাচনী প্রস্তুতি প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের আশ্বস্ত করে বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার আসনে বিকল্প দক্ষ প্রার্থী থাকায় নির্বাচনের মাঠে দলের কার্যক্রমে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। তিনি দাবি করেন, বিএনপি একটি সুসংগঠিত দল এবং প্রতিটি আসনেই যোগ্য নেতৃত্ব তৈরি রয়েছে। নেত্রীর অনুপস্থিতিতে সৃষ্ট আবেগ ও শ্রদ্ধা ভোটারদের মাঝে আরও বেশি সংহতি তৈরি করবে। নির্বাচনের প্রতিটি পদক্ষেপে বেগম জিয়ার অসমাপ্ত সংগ্রাম এবং জনগণের প্রতি তার ভালোবাসার প্রতিফলন ঘটবে বলে তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু পরবর্তী সময়ে বিএনপির এই অবস্থান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। শোককে শক্তিতে রূপান্তর করার এই ডাক মূলত নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করার একটি কৌশল। দীর্ঘকাল ক্ষমতার বাইরে থাকা এবং দমন-পীড়নের শিকার হওয়ার পর, নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে শীর্ষ নেত্রীর প্রয়াণ দলটির জন্য এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা। তবে সালাহউদ্দিন আহমদের এই বক্তব্য স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, বিএনপি আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে সাংগঠনিক দৃঢ়তা এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞার সাথে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে চায়।
সালাহউদ্দিন আহমদ আরও বলেন, বেগম খালেদা জিয়া সবসময় বলতেন দেশ ও জনগণ সবার আগে। আমরা আজ তার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে শপথ নিয়েছি যে, কোনো বাধা বা প্রতিকূলতা আমাদের পথরোধ করতে পারবে না। দেশের মানুষের ভোটাধিকার পুনরুদ্ধার এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠাই হবে তার বিদেহী আত্মার প্রতি আমাদের প্রকৃত শ্রদ্ধা। তার স্মৃতি ও সংগ্রামকে সঙ্গী করে বিএনপি একটি ইনসাফভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে নিরলস কাজ করে যাবে।
কবর জিয়ারতের সময় বিএনপির অন্যান্য কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। দোয়া মোনাজাতে বেগম খালেদা জিয়ার আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং দেশের শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য বিশেষ প্রার্থনা করা হয়। দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগামী দিনগুলোতে নেত্রীর স্মরণে সারা দেশে দোয়া মাহফিল ও আলোচনা সভার মাধ্যমে তার রাজনৈতিক জীবন ও আদর্শ সাধারণ মানুষের কাছে আরও বিস্তৃতভাবে তুলে ধরা হবে। শোকাতুর নেতাকর্মীদের এই জমায়েত প্রমাণ করেছে যে, বেগম খালেদা জিয়া কেবল একজন রাজনৈতিক নেত্রী ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন দলটির ঐক্যের মূল প্রতীক।

