মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতবিক্ষত দেশ সিরিয়ায় উগ্রবাদী গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) বিরুদ্ধে পরিচালিত মার্কিন ও সিরীয় যৌথ বাহিনীর বিশেষ সামরিক অভিযান ‘অপারেশন হকআই’ (Operation Hawkeye) বড় ধরনের সাফল্য অর্জন করেছে। অভিযানের প্রথম ৯ দিনে অন্তত ৭ জন আইএস যোদ্ধা নিহত হয়েছে এবং গ্রেপ্তার করা হয়েছে আরও ১৮ জনকে। গত ২০ ডিসেম্বর শুরু হওয়া এই অভিযানে জঙ্গিগোষ্ঠীটির অন্তত ৪টি কৌশলগত অস্ত্রাগার ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে মার্কিন প্রতিরক্ষা বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকোম)।
মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে সেন্টকোম জানায়, ২০ ডিসেম্বর থেকে ২৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত সিরিয়ার বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় মোট ১১ দফা নিখুঁত অভিযান (Precision Strikes) চালানো হয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত এই অভিযানে আইএসের নেটওয়ার্ক ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে আইএসের কয়েকজন মাঠপর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ কমান্ডার রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা গোষ্ঠীটির অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা ও সাংগঠনিক শক্তিতে বড় ধরনের আঘাত হানবে।
সেন্টকোমের তথ্যমতে, ২০১৪ সালে সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে চলমান গৃহযুদ্ধের সুযোগে আইএসের উত্থান ঘটেছিল। এক সময় সিরিয়া ও ইরাকের বিশাল ভূখণ্ড দখল করে নিজেদের খেলাফত ঘোষণা করলেও বর্তমানে গোষ্ঠীটি অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। যুক্তরাষ্ট্র, ন্যাটো এবং রুশ বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে তারা তাদের দখলকৃত ভূখণ্ডের প্রায় চার-পঞ্চমাংশই হারিয়েছে। বর্তমানে আইএসের হাতে থাকা অবশিষ্ট নগণ্য এলাকাগুলোও পুনরুদ্ধারে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা ইতিবাচক ধারণা পোষণ করছেন।
সিরিয়ায় বর্তমানে প্রায় ১ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে, যারা মূলত স্থানীয় মিত্র বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে আইএসের পুনরুত্থান রোধে কাজ করছে। ২০১৪ সালে আইএসের চূড়ান্ত দাপটের সময় প্রায় ২ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হলেও পরিস্থিতির উন্নতি সাপেক্ষে সেই সংখ্যা বর্তমানে অর্ধেকে কমিয়ে আনা হয়েছে। তবে গত ডিসেম্বরের শুরুর দিকে সিরিয়ার পালমিরায় একটি অতর্কিত হামলাকে কেন্দ্র করে পুনরায় সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়।
উল্লেখ্য, ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে পালমিরা শহরে একটি মার্কিন-সিরীয় যৌথ টহলে হামলা চালিয়েছিল আইএস। সেই ভয়াবহ বন্দুকযুদ্ধে ২ জন মার্কিন সেনা এবং একজন স্থানীয় দোভাষী প্রাণ হারান, আহত হন আরও বেশ কয়েকজন। সেই রক্তক্ষয়ী হামলার কঠোর জবাব দিতেই মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন ‘অপারেশন হকআই’ শুরু করার নির্দেশ দেয়। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এই অভিযানের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আগেই বলেছিলেন, এটি কোনো নতুন যুদ্ধের সূচনা নয় বরং আমাদের সেনাদের ওপর হামলার একটি শক্তিশালী এবং প্রতিশোধমূলক পাল্টা পদক্ষেপ। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, আইএসের হুমকি পুরোপুরি নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত এই অভিযান অব্যাহত থাকবে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এই ৯ দিনের অভিযানে ৭ জন নিহতের চেয়েও আইএসের ৪টি অস্ত্রাগার ধ্বংস হওয়া এবং ১৮ জন সদস্যের ধরা পড়া বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। এর ফলে গোষ্ঠীটির লজিস্টিক ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে এবং ভবিষ্যতে তারা বড় ধরনের কোনো আত্মঘাতী বা গেরিলা হামলা চালানোর সক্ষমতা হারাবে। সিরিয়ার মরু অঞ্চলে লুকিয়ে থাকা আইএসের অবশিষ্ট সদস্যদের খুঁজে বের করতে ড্রোন ও স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ব্যবহার করে নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে।
বিবৃতিতে মার্কিন সেন্টকোম আরও জানিয়েছে, সাধারণ নাগরিকদের জানমালের ক্ষতি এড়াতে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করে প্রতিটি অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। সিরিয়ায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে এবং আইএসের মতো চরমপন্থী গোষ্ঠীর চূড়ান্ত পতন নিশ্চিত করতে মার্কিন বাহিনী তাদের মিত্রদের সঙ্গে নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী কৌশল বজায় রাখবে।

