এক সুদীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ রাজনৈতিক মহাকাব্যের সমাপ্তি ঘটিয়ে আজ না ফেরার দেশে চলে গেছেন বাংলাদেশের ইতিহাসের অবিসংবাদিত নেত্রী, তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। আজ মঙ্গলবার ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে তাঁর শেষ নিশ্বাস ত্যাগের খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই পুরো হাসপাতাল প্রাঙ্গণে এক গুমোট নিস্তব্ধতা ও গভীর শূন্যতা বিরাজ করছে।
প্রিয় নেত্রীকে শেষবারের মতো একনজর দেখার আকুলতা নিয়ে ভোরের আলো ফোটার আগেই হাসপাতালের সামনে জড়ো হতে থাকেন দলটির হাজার হাজার শোকার্ত নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ। তাদের সবার চোখেমুখে প্রিয় অভিভাবককে হারানোর বেদনা এবং অশ্রুসিক্ত নয়নে বিদেহী আত্মার জন্য প্রার্থনার চিত্রই আজ রাজধানীর সবচেয়ে করুণ দৃশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মঙ্গলবার দুপুরে হাসপাতাল এলাকা ঘুরে দেখা যায়, চারদিকে এক থমথমে পরিবেশ। হাসপাতালের প্রধান প্রবেশপথে কড়া নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ, বিজিবি ও র্যাব সদস্যরা মোতায়েন রয়েছেন। অন্য রোগীদের চিকিৎসা সেবায় যেন কোনো বিঘ্ন না ঘটে, সেজন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নেতাকর্মীদের সুশৃঙ্খলভাবে নির্দিষ্ট দূরত্বে অবস্থানের অনুরোধ জানাচ্ছে।
সকালের দিকে ভিড় প্রবল থাকলেও দুপুরের পর উপস্থিতির সংখ্যা কিছুটা কমলেও মানুষের আসা থামেনি। আগামীকাল বুধবার সকাল ১১টায় মরদেহ জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে নেওয়ার আগ পর্যন্ত হাসপাতালে সাধারণের প্রবেশের সুযোগ নেই—এমন ঘোষণা সত্ত্বেও দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসছেন প্রিয় নেত্রীর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে। বিশেষ করে বয়োবৃদ্ধ নেতাকর্মীদের কান্নায় পরিবেশ ভারী হয়ে উঠছে।
ঢাকার পার্শ্ববর্তী রূপগঞ্জ থেকে আসা প্রবীণ বিএনপি সমর্থক সৈয়দ মোহাম্মদ আলী ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বলেন, “খালেদা জিয়া আমাদের কাছে কেবল একজন নেত্রী নন, তিনি ছিলেন গণতন্ত্রের মা। রাজনীতির এক ক্রান্তিলগ্নে তাঁর এই চলে যাওয়া আমাদের অভিভাবকহীন করে দিল। আল্লাহ তাঁকে জান্নাত নসিব করুন।” বাড্ডার বেরাইদ এলাকা থেকে আসা মোহাম্মদ নাসির বলেন, “সকালে খবর পেয়েই এখানে ছুটে এসেছি। নেত্রী দীর্ঘ সময় গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছেন, কারাবরণ করেছেন। অথচ যখন তিনি মুক্ত হলেন, তখনই চিরবিদায় নিলেন—এটি মেনে নেওয়া বড় কঠিন।”
বেগম খালেদা জিয়ার এই চলে যাওয়া মানে বাংলাদেশের ইতিহাসের ৪৩ বছরের এক বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক অধ্যায়ের অবসান। ১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট জন্মগ্রহণ করা এই মহীয়সী নারীর শৈশব কেটেছে দিনাজপুরে। ১৯৬০ সালে সেনাপ্রধান ও পরবর্তীকালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর তিনি ফার্স্ট লেডি হিসেবে দেশের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন।
তবে ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের শাহাদাত বরণের পর দলের অস্তিত্ব যখন সংকটে, তখন ১৯৮২ সালে রাজনীতিতে তাঁর আকস্মিক কিন্তু সাহসী পদার্পণ ঘটে। ১৯৮৪ সালে চেয়ারপারসন নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি সাত দলীয় জোট গঠন করে তৎকালীন সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রাম শুরু করেন। সেই দীর্ঘ লড়াইয়ে তাঁকে বারবার কারাবরণ ও গৃহবন্দী হতে হলেও তিনি গণতন্ত্রের প্রশ্নে কখনো মাথানত করেননি, যার ফলে জাতি তাঁকে ‘আপসহীন নেত্রী’ উপাধিতে ভূষিত করে।
১৯৯১ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে জয়লাভের মাধ্যমে তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বের আমলেই মেয়েদের শিক্ষা অবৈতনিক করা, বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা এবং উপবৃত্তি কর্মসূচি চালুর মতো যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেওয়া হয়, যা বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে এক নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছিল।
এ ছাড়াও তিনি সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়িয়ে ৩০ বছরে উন্নীত করেন। ২০০৫ সালে বিশ্বখ্যাত ফোর্বস ম্যাগাজিন তাঁকে বিশ্বের ক্ষমতাধর নারীদের তালিকায় ২৯তম স্থানে স্থান দিয়েছিল। সংসদীয় ইতিহাসে প্রতিটি নির্বাচনে লড়া প্রতিটি আসনেই জয়লাভ করার অনন্য রেকর্ড কেবল তাঁরই অধিকারে। ২০১১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সি স্টেট সিনেট গণতন্ত্র রক্ষায় তাঁর অবিস্মরণীয় অবদানের জন্য তাঁকে ‘গণতন্ত্রের যোদ্ধা’ উপাধিতে সম্মানিত করে।
জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে তিনি চরম রাজনৈতিক বৈরিতার শিকার হয়েছিলেন। ২০১৮ সালে বিতর্কিত মামলায় তাঁকে কারারুদ্ধ করা হলেও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো সেই বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। দীর্ঘ কারাবাস ও অসুস্থতার পর ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশ ফ্যাসিবাদের হাত থেকে মুক্ত হলে তিনি পুনরায় সব মামলা থেকে মুক্তি ও সম্মান ফিরে পান।
কিন্তু বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক জটিলতা তাঁকে আর সুস্থ হয়ে ফেরার সুযোগ দিল না। গত ২৩ নভেম্বর থেকে টানা ৪০ দিন এভারকেয়ার হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে আজ তিনি পাড়ি জমালেন অমৃতলোকে। তাঁর এই বিদায় কেবল একটি দলের ক্ষতি নয়, বরং বাংলাদেশের ইতিহাসের এক বিশাল বটবৃক্ষের পতন। তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দেশজুড়ে এখন কেবলই প্রার্থনার গুঞ্জন— “বিদায়, আপসহীন দেশনেত্রী।”

