বাংলাদেশের রাজনীতির এক প্রবাদপ্রতিম নক্ষত্র বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণে আজ সমাপ্ত হলো ৪১ বছরের এক মহাকাব্যিক রাজনৈতিক যাত্রার। মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) ভোরে তাঁর চিরবিদায়ের সংবাদটি কেবল একটি দলের নেত্রীর প্রস্থান নয়, বরং এটি দেশের ইতিহাসের এক দীর্ঘ সংগ্রামী অধ্যায়ের অবসান। ১৯৮৪ সালে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বে আসীন হওয়া থেকে শুরু করে ২০২৫-এর অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত—বিগত চার দশকে তিনি হয়ে উঠেছিলেন গণতন্ত্রকামী মানুষের আস্থার প্রতীক এবং এ দেশের রাজনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরে জন্মগ্রহণ করা বেগম খালেদা জিয়ার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে এক শান্ত পরিবেশে। ১৯৬০ সালে তৎকালীন ক্যাপ্টেন (পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রপতি) জিয়াউর রহমানের সঙ্গে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হওয়ার পর দীর্ঘকাল তিনি এক নিভৃতচারী গৃহবধূ হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। তবে ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে এক সামরিক অভ্যুত্থানে স্বামী জিয়াউর রহমানের শাহাদাতবরণ তাঁর জীবনের গতিপথ চিরতরে বদলে দেয়। চরম সংকটে পড়া দলের হাল ধরতে ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৮৪ সালের ১০ মে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই শুরু হয় তাঁর ‘আপসহীন’ অভিযাত্রা।
বেগম জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় ছিল নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন। জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে রাজপথের অকুতোভয় সেনানী হিসেবে তিনি সাতদলীয় জোটের নেতৃত্ব দেন। আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে সাতবার গৃহবন্দি হওয়া সত্ত্বেও তিনি সামরিক জান্তার সঙ্গে কোনো প্রকার আপস করেননি, যা তাঁকে ‘আপসহীন নেত্রী’র চিরস্থায়ী খেতাব এনে দেয়। ১৯৯১ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে জয়লাভ করে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচিত হন। তাঁর আমলেই দেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রবর্তন ঘটে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বিশাল মাইলফলক।
দীর্ঘ ৪১ বছরের এই রাজনৈতিক পথচলা কখনোই কণ্টকমুক্ত ছিল না। ২০০৭ সালের ১/১১-এর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে তাঁকে সাবজেলে ৩৭২ দিন বন্দি থাকতে হয়েছিল। সেই কারান্তরীণ অবস্থাতেই তিনি তাঁর মাকে হারান। এরপর ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি দুর্নীতির মামলায় তাঁকে পুনরায় কারাগারে যেতে হয়। প্রায় দুই বছর কারাবন্দি থাকার পর ২০২০ সালে করোনাভাইরাস মহামারীর সময় শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পেলেও তিনি কার্যত গুলশানের বাসভবনে নজরদারিতে ছিলেন। ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর তিনি সম্পূর্ণ মুক্তি পান এবং জীবনের শেষ দিনগুলো প্রিয়জনদের মাঝে অতিবাহিত করার সুযোগ পান।
রাজনৈতিক সংগ্রামের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনেও তাঁকে চরম শোক ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। সেনানিবাসের দীর্ঘদিনের স্মৃতিবিজড়িত মইনুল রোডের বাসভবন হারানো থেকে শুরু করে কনিষ্ঠ পুত্র আরাফাত রহমান কোকোর অকাল মৃত্যু—সবই তিনি সহ্য করেছেন অসীম ধৈর্যের সঙ্গে। দেশের প্রথিতযশা শিক্ষাবিদদের মতে, খালেদা জিয়া ছিলেন এ দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রী, যার প্রমাণ তাঁর অনন্য নির্বাচনী রেকর্ড। দীর্ঘ চার দশকে তিনি যতগুলো আসন থেকে নির্বাচন করেছেন, তার একটিতেও কখনও পরাজিত হননি।
বেগম খালেদা জিয়া কেবল তিনবারের প্রধানমন্ত্রীই ছিলেন না, তিনি ছিলেন জাতীয়তাবাদী দর্শনের প্রধান ধারক। তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি দেশের অন্যতম বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন, নারী শিক্ষার প্রসার এবং গ্রাম বাংলার অবকাঠামো উন্নয়নে তাঁর গৃহিত পদক্ষেপগুলো আজও সাধারণ মানুষের কাছে সমাদৃত।
আজকের এই বিষণ্ন ভোরে তাঁর প্রয়াণে কেবল বিএনপি নয়, সমগ্র জাতি এক অভিভাবককে হারাল। গৃহবধূ থেকে প্রধানমন্ত্রী, আবার রাজপথের লড়াকু নেত্রী থেকে কারান্তরীণ জননী—বেগম খালেদা জিয়ার এই বহুমাত্রিক জীবন ও ৪১ বছরের অবিচল সংগ্রাম বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক অমর উপাখ্যান হয়ে থাকবে।

