বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘বৃহত্তর ঐক্য’ এবং ‘জুলাই প্রজন্ম’কে রক্ষার তাগিদে এক বড় ধরনের কৌশলগত পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম জানিয়েছেন, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনআকাঙ্ক্ষা রক্ষা এবং আধিপত্যবাদী শক্তির চক্রান্ত রুখতে তারা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ সমমনা ১০ দলীয় নির্বাচনী সমঝোতা জোটে অংশগ্রহণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
রোববার রাতে রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই ঘোষণা দেন। এর আগে বিকেলেই জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে এনসিপি ও এলডিপির জোটে আসার বিষয়টি জানানো হয়েছিল। রাতে নাহিদ ইসলাম নিজ দলীয় অবস্থান পরিষ্কার করে বলেন, এককভাবে ৩০০ আসনে লড়াইয়ের প্রস্তুতি থাকলেও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদির ‘শাহাদাত’ পরবর্তী পরিবর্তিত পরিস্থিতি তাদের এই বৃহত্তর ঐক্যের পথে চালিত করেছে।
সংবাদ সম্মেলনে নাহিদ ইসলাম বলেন, “আমরা শুরু থেকেই এককভাবে এবং স্বতন্ত্র স্বকীয়তা নিয়ে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। কিন্তু ১২ ডিসেম্বর বিজয়নগরে শরীফ ওসমান হাদিকে যেভাবে জনসমক্ষে গুলি করে শহীদ করা হয়েছে, তাতে এটি স্পষ্ট যে—৫ আগস্টের পরাজিত আধিপত্যবাদী ও আগ্রাসী শক্তিগুলো এখনো সক্রিয়। তারা নির্বাচন বানচাল করতে এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অর্জনকে ধূলিসাৎ করতে মরণকামড় দিচ্ছে।” তিনি আরও যোগ করেন, “আজ ওসমান হাদিকে টার্গেট করা হয়েছে, কাল হয়তো আমাদের কাউকে করা হবে। জুলাই বিপ্লবের অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দেওয়ার এই চক্রান্ত রুখতে এখন বিভেদ নয়, বরং রাজপথের লড়াকু শক্তিগুলোর ইস্পাতকঠিন ঐক্য প্রয়োজন।”
এনসিপি প্রধান এই জোটকে ‘আদর্শিক জোট’ না বলে ‘নির্বাচনী সমঝোতা জোট’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি জানান, জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের সমমনা আটটি দলের সাথে তাদের এই সমঝোতা মূলত তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে—বিপ্লব পরবর্তী সংস্কার বাস্তবায়ন, বিচার নিশ্চিতকরণ এবং আধিপত্যবাদ ও দুর্নীতির মূলোৎপাটন। নাহিদ ইসলাম বলেন, “এটি কেবল আসন ভাগাভাগির অঙ্ক নয়; বরং জুলাই প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা রক্ষা এবং বাংলাদেশকে একটি নতুন বন্দোবস্তের দিকে নিয়ে যাওয়ার কৌশলগত লড়াই।”
জোটের রূপরেখা সম্পর্কে তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, সোমবার (২৯ ডিসেম্বর) এনসিপি তাদের মনোনীত প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করবে। সমঝোতা অনুযায়ী যেসব আসনে এনসিপির প্রার্থী থাকবে না, সেখানে তারা জোটের অন্য প্রার্থীদের পক্ষে সক্রিয়ভাবে প্রচারণা চালাবে। এছাড়া তার দল এবং সহযোগী সংগঠনগুলো দেশব্যাপী ‘গণভোট’ বা ‘নতুন বন্দোবস্ত’ এর পক্ষে ক্যাম্পেইন অব্যাহত রাখবে।
সংবাদ সম্মেলনে দলের ভেতরে জোট নিয়ে অসন্তোষ বা পদত্যাগের বিষয়ে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, দলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বৃহত্তর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। যারা আদর্শ ও নীতির প্রশ্নে এনসিপিকে সমর্থন করেন, তারা এই ক্রান্তিকালে ঐক্যের গুরুত্ব অনুধাবন করবেন বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেনসহ কেন্দ্রীয় কমিটির শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
এনসিপির এই নাটকীয় অন্তর্ভুক্তি ১০ দলীয় জোটকে নির্বাচনী মাঠে বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তির বিপরীতে এক শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড় করিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

