জাতীয় নাগরিক পার্টির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব তাসনিম জারার পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করা তাসনিম জারা ব্যক্তিগত ও কৌশলগত কারণে দলের পদ ছেড়েছেন। তাসনিম জারা নিজেও তার ফেসবুক পোস্টে খিলগাঁও, সবুজবাগ ও মুগদাবাসীর উদ্দেশ্যে দীর্ঘ এক বার্তা প্রদান করেন, যেখানে তার রাজনৈতিক দর্শন এবং স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করার পেছনের কারণগুলো স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
তাসনিম জারা তার বার্তায় বলেন, “আমি আপনাদের ঘরের মেয়ে। খিলগাঁওয়েই আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। আমার স্বপ্ন ছিল একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক দলের প্ল্যাটফর্ম থেকে সংসদে গিয়ে এলাকার মানুষের সেবা করা। তবে বর্তমান বাস্তবিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে আমি কোনো নির্দিষ্ট দল বা জোটের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ার যে প্রতিশ্রুতি তিনি দেশবাসীকে দিয়েছিলেন, তা রক্ষা করতেই তিনি এই কঠিন পথে হাঁটছেন।
একটি প্রতিষ্ঠিত দলের সমর্থন ছাড়া নির্বাচন করা যে কতটা চ্যালেঞ্জিং, তা তাসনিম জারার বক্তব্যে উঠে এসেছে। তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন যে, দলীয় প্রার্থী হলে স্থানীয় কার্যালয়, সুসংগঠিত কর্মী বাহিনী এবং প্রশাসনিক নিরাপত্তা পাওয়ার সুযোগ থাকে। কিন্তু স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তার একমাত্র ভরসা এলাকার সাধারণ মানুষ।
বাংলাদেশের নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হলে সংশ্লিষ্ট আসনের মোট ভোটারের ১ শতাংশের স্বাক্ষর সংগ্রহ করে জমা দিতে হয়। ঢাকা-৯ আসনের জন্য তাসনিম জারাকে ৪ হাজার ৬৯৩ জন ভোটারের সমর্থনযুক্ত স্বাক্ষর সম্বলিত ফরম পূরণ করতে হবে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ মাত্র এক দিনে সম্পন্ন করা প্রায় অসম্ভব উল্লেখ করে তিনি এলাকার মানুষের কাছে স্বতঃস্ফূর্ত সাহায্যের আবেদন জানিয়েছেন। আগামীকাল থেকেই এই স্বাক্ষর সংগ্রহের কাজ শুরু হবে এবং এর জন্য তিনি স্বেচ্ছাসেবকদের একটি গ্রুপে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
তাসনিম জারার এই পদত্যাগ এবং স্বতন্ত্র হিসেবে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তের ফলে তার নির্বাচনী তহবিলে অনুদান দেওয়া সমর্থকদের জন্য তিনি একটি বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। ইতিপূর্বে এনসিপির প্রার্থী হিসেবে তিনি যখন নির্বাচনী ফান্ডরেইজিং বা তহবিল সংগ্রহের আবেদন করেছিলেন, তখন অনেক সাধারণ মানুষ তাকে অর্থ সাহায্য দিয়েছিলেন।
এখন যেহেতু তিনি দলের প্রার্থী নন, তাই নৈতিকতার জায়গা থেকে তিনি ঘোষণা করেছেন, যারা তার পরিবর্তিত সিদ্ধান্তের কারণে অর্থ ফেরত পেতে চান, তাদের পূর্ণ শ্রদ্ধা জানানো হবে। যারা বিকাশ বা ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা পাঠিয়েছেন, তাদের জন্য একটি নির্দিষ্ট গুগল ফরম দেওয়া হয়েছে। ট্রানজেকশন আইডি যাচাই-বাছাই করে দ্রুততম সময়ে এই অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। তার এই পদক্ষেপকে দেশের রাজনীতিতে সততা ও স্বচ্ছতার এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে দেখছেন নেটিজেনরা।
তাসনিম জারার এই সাহসী সিদ্ধান্ত ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-৯ আসনের নির্বাচনী সমীকরণকে পুরোপুরি পাল্টে দিতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে তার যে জনপ্রিয়তা রয়েছে, তা ভোটের মাঠে কেমন প্রভাব ফেলে সেটাই এখন দেখার বিষয়। দলীয় লেজুড়বৃত্তি এড়িয়ে স্বতন্ত্রভাবে জনগণের সেবা করার এই অদম্য ইচ্ছাশক্তি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন ধারার সূচনা করতে পারে।
সবশেষে তাসনিম জারা তার সমর্থকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, “আপনাদের মেয়ে হিসেবে আমার সততা ও নিষ্ঠার ওপর যদি আপনাদের আস্থা থাকে, তবেই আমি সেবা করার সুযোগ পাব।” এখন দেখার বিষয়, মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ৪ হাজার ৬৯৩ জন ভোটারের স্বাক্ষর সংগ্রহ করে তিনি তার মনোনয়নপত্রের বৈধতা নিশ্চিত করতে পারেন কি না।

