দীর্ঘ জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে শনিবার বিকেলে বিএনপির কেন্দ্রীয় হাইকমান্ড চট্টগ্রামের তিনটি আসনের চূড়ান্ত প্রার্থীদের নাম প্রকাশ করে। এই রদবদলের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড ও চট্টগ্রাম নগরের আংশিক) আসনের প্রার্থী পরিবর্তন। এই আসনে ইতিপূর্বে প্রাথমিকভাবে মনোনীত প্রার্থী কাজী মোহাম্মদ সালাউদ্দিনকে বাদ দিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও প্রভাবশালী নেতা মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরীকে চূড়ান্ত মনোনয়ন প্রদান করা হয়েছে।
দলের এই সিদ্ধান্তটি চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। উল্লেখ্য যে, গত ৩ নভেম্বর যখন উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক কাজী মোহাম্মদ সালাউদ্দিনকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়, তখন সীতাকুণ্ড এলাকায় আসলাম চৌধুরীর সমর্থকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভকারীরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও রেলপথ অবরোধ করে তাদের দাবির পক্ষে অবস্থান নেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দলের চেইন অফ কমান্ড বজায় রাখতে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত স্থানীয় জনমত ও আসলাম চৌধুরীর রাজনৈতিক প্রভাবকে বিবেচনায় নিয়ে বিএনপি তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করল।
প্রার্থী তালিকায় দ্বিতীয় বড় চমকটি এসেছে চট্টগ্রাম-১০ ও চট্টগ্রাম-১১ আসনকে কেন্দ্র করে। বিএনপির নীতি-নির্ধারণী ফোরাম তথা স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে তার পূর্বঘোষিত আসন চট্টগ্রাম-১০ (হালিশহর-পাহাড়তলী-পাঁচলাইশ) থেকে সরিয়ে চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা) আসনে স্থানান্তর করা হয়েছে। এর ফলে চট্টগ্রাম-১১ আসনের দীর্ঘদিনের প্রার্থিতা জটিলতার অবসান ঘটল।
এতদিন এই আসনটিতে দলের কোনো সুনির্দিষ্ট প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা না হলেও আমীর খসরুর পুত্র ইসরাফিল খসরু এবং নগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান জোরালো মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। তবে বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের হৃৎপিণ্ড হিসেবে পরিচিত এই আসনে বিজয় নিশ্চিত করতে দলের অভিজ্ঞতম সেনাপতি আমীর খসরুকেই উপযুক্ত মনে করেছে হাইকমান্ড।
আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সরে যাওয়ার ফলে চট্টগ্রাম-১০ আসনে বিএনপির মশাল তুলে দেওয়া হয়েছে তরুণ ও প্রতিশ্রুতিশীল নেতা সাঈদ আল নোমান তূর্যের হাতে। তিনি বিএনপির বর্ষীয়ান নেতা ও সাবেক মন্ত্রী আব্দুল্লাহ আল নোমানের সুযোগ্য সন্তান। সাঈদ আল নোমানের মনোনয়নের মাধ্যমে চট্টগ্রামে বিএনপির দীর্ঘদিনের রাজপথের ত্যাগী পরিবারের উত্তরাধিকার সংরক্ষিত হলো বলে মনে করছেন দলটির তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীরা। বাবার রাজনৈতিক ঐতিহ্য এবং নিজের তারুণ্যের উদ্দীপনা কাজে লাগিয়ে তিনি এই আসনে ধানের শীষের বিজয় পুনরুদ্ধারে লড়াই করবেন।
চট্টগ্রামের এই সামগ্রিক পরিবর্তন সম্পর্কে বিএনপির বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবের রহমান শামীম সংবাদমাধ্যমকে জানান, দলীয় শৃঙ্খলা এবং বৃহত্তর নির্বাচনী কৌশল মাথায় রেখেই এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “চট্টগ্রাম-৪ আসনে আসলাম চৌধুরী, চট্টগ্রাম-১০ আসনে সাঈদ আল নোমান এবং চট্টগ্রাম-১১ আসনে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীই এখন ধানের শীষের চূড়ান্ত কাণ্ডারি। আমরা বিশ্বাস করি, এই শক্তিশালী প্রার্থীরা চট্টগ্রামের প্রতিটি আসনে জনগণের ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারে কার্যকর ভূমিকা রাখবেন।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চট্টগ্রামের এই তিনটি আসনের রদবদল বিএনপির জন্য ‘মাস্টারস্ট্রোক’ হিসেবে গণ্য হতে পারে। একদিকে আসলাম চৌধুরীর মতো লড়াকু নেতাকে সীতাকুণ্ডে ফিরিয়ে এনে অভ্যন্তরীণ বিবাদ মিটিয়ে ফেলা হয়েছে, অন্যদিকে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে বন্দর আসনে স্থানান্তর করে কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকার চেষ্টা করা হয়েছে। পাশাপাশি সাঈদ আল নোমানের মতো তরুণ প্রার্থীকে সামনে এনে নতুন ভোটারদের আকৃষ্ট করার পথে হাঁটল দলটি।
গত ৩ নভেম্বর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ঘোষণার পর থেকে যে অস্থিরতা ও বিভাজন দৃশ্যমান ছিল, শনিবারের এই চূড়ান্ত তালিকা সেই মেঘ কাটিয়ে চট্টগ্রামের নেতা-কর্মীদের মধ্যে নতুন প্রাণের সঞ্চার করবে বলে আশা করা হচ্ছে। সীতাকুণ্ডে আসলাম চৌধুরীর চূড়ান্ত মনোনয়নের খবরে ইতোমধ্যে তার অনুসারীরা আনন্দ মিছিল করেছেন। এখন সব বিভেদ ভুলে নির্বাচনী ময়দানে একযোগে কাজ করাই হবে চট্টগ্রাম বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

