দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের পর এক আবেগঘন পরিবেশে জুলাই বিপ্লবের অন্যতম অগ্রসেনানী শহীদ শরিফ ওসমান হাদি এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধিতে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। শনিবার (২৭ ডিসেম্বর) সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ সংলগ্ন এই দুই ব্যক্তিত্বের মাজারে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও বিশেষ মোনাজাতের মাধ্যমে তিনি তাঁর দিনের কর্মসূচি শুরু করেন।
সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে রাজধানীর গুলশানের বাসভবন থেকে যাত্রা শুরু করে বেলা ১১টা ১৬ মিনিটে তারেক রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে পৌঁছান। এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ তাঁকে স্বাগত জানান। নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় তাঁর আগমনে এক অভূতপূর্ব পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
তারেক রহমান প্রথমে ‘ইনকিলাব মঞ্চ’-এর মুখপাত্র ও ছাত্র-জনতার আন্দোলনের অন্যতম তরুণ নেতা শহীদ শরিফ ওসমান হাদির সমাধিতে শ্রদ্ধা জানান। উল্লেখ্য, গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর পল্টনে দুর্বৃত্তদের গুলিতে গুরুত্বর আহত হওয়ার পর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাদি শাহাদাতবরণ করেন।
তাঁর এই আত্মত্যাগ জুলাই অভ্যুত্থানের পরবর্তী বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে এক অনন্য প্রেরণা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর তারেক রহমান জুলাই বিপ্লবের সকল শহীদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে মোনাজাত করেন।
এরপর তিনি পার্শ্ববর্তী জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। কবির মাজারে পুষ্পস্তবক অর্পণের পর সেখানে কিছুক্ষণ নিরবতা পালন করেন এবং ফাতেহা পাঠ করেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, সালাহউদ্দিন আহমেদ, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীসহ দলের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ। এছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খানসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট শিক্ষকমণ্ডলী শ্রদ্ধা নিবেদনকালে উপস্থিত ছিলেন।
কবর জিয়ারত শেষে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তারেক রহমান বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ত্যাগ করেন। দলীয় সূত্রে জানানো হয়েছে, সেখান থেকে তিনি সরাসরি নির্বাচন কমিশন (ইসি) অভিমুখে যাত্রা করেন। মূলত আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজের ভোটার নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার লক্ষ্যেই তাঁর এই ইসি সফর।
২০০৮ সালে ভোটার তালিকা হালনাগাদের সময় বিদেশে অবস্থান করায় তাঁর নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছিল। দীর্ঘ সময় পর দেশের মাটিতে ফিরেই তিনি আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার এই পদক্ষেপ নিলেন।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জাতীয় নির্বাচনে বগুড়া-৬ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে তারেক রহমানের পক্ষে ইতোমধ্যে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে ভোটার হওয়ার আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে তিনি ধানমন্ডি এলাকায় তাঁর শ্বশুরবাড়িতে যাবেন বলে জানা গেছে। পরবর্তীতে সন্ধ্যায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তাঁর মাতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে দেখতে যাওয়ার কথা রয়েছে।
গত ২৫ ডিসেম্বর লন্ডন থেকে দেশে ফেরার পর এটিই তারেক রহমানের প্রথম আনুষ্ঠানিক ও প্রকাশ্য কর্মসূচি। বিমানবন্দর থেকে পূর্বাচলের ঐতিহাসিক জনসভায় লক্ষ লক্ষ মানুষের উদ্দেশ্যে দেওয়া তাঁর বক্তব্যে তিনি একটি বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছিলেন। আজকের এই শ্রদ্ধা নিবেদন ও ভোটার হওয়ার প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের মূল ধারায় তাঁর আনুষ্ঠানিক প্রত্যাবর্তনের শক্তিশালী সংকেত হিসেবে দেখছেন।

