বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক দীর্ঘ নির্বাসন ও প্রতীক্ষিত অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়ে আজ বিকেলে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দীর্ঘ ১৯ বছর পর আজ শুক্রবার বিকেল ৪টা ৪০ মিনিটে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত তাঁর পিতার মাজারে শ্রদ্ধা জানানোর এই দৃশ্যটি উপস্থিত হাজার হাজার নেতাকর্মীর মাঝে এক গভীর ও সংবেদনশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।
২০০৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে শেষবারের মতো এই স্মৃতিধন্য স্থানে শ্রদ্ধা জানিয়েছিলেন তিনি। এরপর দীর্ঘ রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও প্রবাস জীবনের কারণে নিজের পিতৃভূমিতে শ্রদ্ধা জানানোর এই সুযোগটি তার জন্য ছিল এক দীর্ঘ অপেক্ষার নাম।
গতকাল বৃহস্পতিবার দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে দেশে ফেরার পর আজ ছিল তার প্রথম জনসমক্ষে শ্রদ্ধা নিবেদনের কর্মসূচি। আজ দুপুরে গুলশানের বাসভবন থেকে লাল-সবুজ রঙে সজ্জিত বিশেষ বাসে করে তিনি শেরেবাংলা নগরের উদ্দেশে রওনা হন। যাত্রাপথে রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লাখো নেতাকর্মীর অভিবাদন ও স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
তারেক রহমানের এই প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে চন্দ্রিমা উদ্যান ও মাজার প্রাঙ্গণ সকাল থেকেই জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছিল। ব্যানার, ফেস্টুন আর জাতীয় পতাকায় ছেয়ে যাওয়া এই বিশাল সমাবেশে নেতাকর্মীদের মাঝে ছিল বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস, যা দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক নতুন উদ্দীপনার সঞ্চার করেছে।
মাজার প্রাঙ্গণে পৌঁছে তারেক রহমান পুষ্পস্তবক অর্পণের পর পরম শ্রদ্ধাভরে কিছুক্ষণ নিরবতা পালন করেন এবং মহান আল্লাহর দরবারে তার মরহুম পিতার আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ মোনাজাতে অংশ নেন। এ সময় তার চোখেমুখে ফুটে ওঠে এক গভীর আবেগ ও পিতৃহারা সন্তানের দীর্ঘ প্রতীক্ষার ক্লান্তি শেষে প্রাপ্তির ছাপ।
তাঁর এই শ্রদ্ধা নিবেদনের সময় উপস্থিত ছিলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্যবৃন্দ এবং দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ। দীর্ঘ ১৯ বছর পর এই স্থানে তাঁর ফিরে আসাকে দলীয় নেতাকর্মীরা ‘গণতন্ত্রের পুনর্জন্ম’ এবং ‘নতুন ভোরের সূচনা’ হিসেবে অভিহিত করছেন।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে বলতে গেলে, আজ শেরেবাংলা নগর এলাকায় ছিল অভূতপূর্ব সতর্কতা। পুলিশের পাশাপাশি র্যাব, বিজিবি, আনসার এবং সাদা পোশাকের বিপুল সংখ্যক গোয়েন্দা সদস্য পুরো এলাকাটি কঠোর নিরাপত্তা বলয়ে ঢেকে রেখেছিলেন।
তারেক রহমানের নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী ‘চেয়ারপারসন সিকিউরিটি ফোর্স’ (সিএসএফ) সার্বক্ষণিক সমন্বয়ের মাধ্যমে অনুষ্ঠানটি সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করতে সহায়তা করে। উল্লেখ্য যে, গতকাল দেশে ফেরার পরপরই তিনি তাঁর অসুস্থ মা, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে দেখতে হাসপাতালে গিয়েছিলেন, যা দলীয় কর্মীদের মাঝে গভীর মানবিক আবেদনের সৃষ্টি করেছিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের এই মাজার জিয়ারত কেবল একটি দলীয় কর্মসূচি নয়, বরং এটি তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এবং দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি তাঁর প্রগাঢ় শ্রদ্ধাবোধের বহিঃপ্রকাশ। দীর্ঘ ১৯ বছরের এই বিরতি কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং এর পেছনে লুকিয়ে আছে দেশের রাজনৈতিক সংকটের এক সুদীর্ঘ ইতিহাস।
আজ পিতার কবরে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর তাঁর পরবর্তী গন্তব্য নির্ধারিত রয়েছে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধ, যেখানে তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের প্রতি জাতীয়ভাবে শ্রদ্ধা জানাবেন।
তারেক রহমানের এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তন এবং ধারাবাহিকভাবে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে শ্রদ্ধা নিবেদন কর্মসূচি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির রূপরেখা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং নেতাকর্মীদের উদ্দীপনা প্রমাণ করছে যে, মাঠ পর্যায়ের রাজনীতিতে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে মাজার প্রাঙ্গণ থেকে তিনি যখন স্মৃতিসৌধের উদ্দেশে রওনা হন, তখন পেছনে ফেলে যান এক দীর্ঘ সংগ্রামের ইতি এবং সম্মুখপানে গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার এক নতুন প্রতিশ্রুতি।

