দীর্ঘ ১৭ বছরের প্রবাস জীবন শেষে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করতে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে যাচ্ছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার এই সফরকে কেন্দ্র করে আজ শুক্রবার সকাল থেকেই ঐতিহাসিক এই স্মৃতিসৌধ এবং এর আশপাশ এলাকায় এক নজিরবিহীন ও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
নিরাপত্তার স্বার্থে এবং সুশৃঙ্খল পরিবেশ বজায় রাখতে সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণে প্রবেশ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সফরের আদলে এই নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে।
দলীয় এবং স্থানীয় সূত্রগুলোর তথ্যমতে, আজ জুমার নামাজের পর রাজধানীর গুলশানের বাসভবন থেকে যাত্রা শুরু করেন তারেক রহমান। সফরের প্রথম ধাপে তিনি শেরেবাংলা নগরে তার পিতা, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মাজার জিয়ারত করেন। সেখান থেকে সরাসরি সড়কপথে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধের উদ্দেশে রওনা হন তিনি।
তারেক রহমানের এই সফরকে ঘিরে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক এবং সাভারের সংযোগ সড়কগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যাপক তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে। পুলিশের পাশাপাশি র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব), বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা পুরো এলাকায় নিশ্ছিদ্র নজরদারি চালাচ্ছেন। স্মৃতিসৌধ কমপ্লেক্সের ভেতরে ও বাইরে বিভিন্ন কৌশলগত পয়েন্টে অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন করা হয়েছে।
জাতীয় স্মৃতিসৌধের ইনচার্জ ও সাভার গণপূর্ত বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন খান গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, বিশেষ এই সফরের গুরুত্ব বিবেচনা করে সকাল থেকেই সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত করা হয়েছে। দুপুরে তারেক রহমানের নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী ‘চেয়ারপারসন সিকিউরিটি ফোর্স’ (সিএসএফ) পুরো এলাকাটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে।
তিনি আরও জানান, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে স্মৃতিসৌধ এলাকা ত্যাগ করার পর সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য প্রাঙ্গণটি পুনরায় উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। এই সাময়িক অসুবিধার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জনসাধারণের সহযোগিতা কামনা করেছে।
এদিকে, প্রিয় নেতাকে বরণ করে নিতে এবং শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের এই মুহূর্তে অংশীদার হতে সাভার এলাকায় হাজার হাজার নেতাকর্মীর সমাগম ঘটেছে। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও পয়েন্টে বিএনপি এবং এর অঙ্গ-সংগঠনের নেতাকর্মীরা ব্যানার ও ফেস্টুন হাতে অবস্থান করছেন।
নেতাকর্মীদের কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছে দেশপ্রেম ও দলীয় সংহতির বিভিন্ন স্লোগান। সাধারণ মানুষের মধ্যে তারেক রহমানের এই প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে ব্যাপক উদ্দীপনা ও কৌতূহল দেখা গেছে। দীর্ঘ সময় পর তার এই উপস্থিতি সাভার ও আশপাশের জনপদে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি করেছে।
সাভারের স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের সরাসরি জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদনের এই পদক্ষেপ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি নয়, বরং দেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং সার্বভৌমত্বের প্রতি তার দলের অবিচল আস্থার বহিঃপ্রকাশ।
দীর্ঘ প্রবাস জীবনের পর জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে শ্রদ্ধা নিবেদনের মাধ্যমে তিনি দেশের মূলধারার রাজনীতিতে তার সক্রিয় পদচারণার সুস্পষ্ট বার্তা দিচ্ছেন। এর মাধ্যমে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে যেমন নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়েছে, তেমনি সাধারণ জনগণের মাঝেও তার গ্রহণযোগ্যতা ও রাজনৈতিক অবস্থানের গুরুত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে।
নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা এড়াতে এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা সচল রাখতে সাভার এলাকায় বিশেষ টহল ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। জাতীয় স্মৃতিসৌধের মূল ফটক থেকে শুরু করে স্তম্ভের বেদি পর্যন্ত এলাকাটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে সাজানো হয়েছে।
তারেক রহমান পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে বীর শহীদদের প্রতি সম্মান জানাবেন এবং সেখানে কিছুক্ষণ নিরবতা পালন করবেন বলে জানা গেছে। এরপর তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ মোনাজাতে অংশ নেবেন।
বিকেল গড়ানোর সাথে সাথে সাভার ও নবীনগর এলাকায় জনস্রোত ক্রমশ দীর্ঘ হচ্ছে। বিএনপির নীতিনির্ধারক পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ মনে করছেন, তারেক রহমানের এই সফর বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হবে। বীর শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর মধ্য দিয়ে তিনি যে আগামীর রাজনীতির পথচলা শুরু করছেন, তা দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করবে বলে তাদের প্রত্যাশা। সাভারের আকাশ-বাতাস এখন শ্লোগানে শ্লোগানে মুখরিত, আর সবার দৃষ্টি এখন জাতীয় স্মৃতিসৌধের প্রধান ফটকের দিকে, যেখানে কিছুক্ষণ পরেই উপস্থিত হবেন দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই নেতা।

