বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক আবেগঘন অধ্যায়ের সাক্ষী হলো আজ রাজধানী ঢাকা। দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের প্রথম দিনেই অসুস্থ মা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পাশে ছুটে গেলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মাতার সঙ্গে নিভৃতে কিছু সময় কাটানোর পর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টা ৩৪ মিনিটে তিনি হাসপাতাল প্রাঙ্গণ ত্যাগ করে গুলশানের বাসভবনের উদ্দেশ্যে রওনা হন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল মা ও ছেলের পুনর্মিলন নয়, বরং দেশের প্রধানতম একটি রাজনৈতিক পরিবারের দীর্ঘ বিচ্ছেদের অবসান।
লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দর থেকে যাত্রা করা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার বিজি-২০২ উড়োজাহাজটি আজ বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের প্রতীক্ষার পর যখন তারেক রহমান দেশের মাটিতে পা রাখেন, তখন এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে তাকে পুষ্পস্তবক দিয়ে স্বাগত জানান দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এ সময় দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আলিঙ্গন এবং কুশল বিনিময় করেন তিনি।
বিমানবন্দরেই উপস্থিত ছিলেন তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, কন্যা জাইমা রহমান এবং তার শাশুড়ি। দীর্ঘ নির্বাসনের ক্লান্তি ভুলে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলিঙ্গন করার দৃশ্যটি উপস্থিত অনেককেই আপ্লুত করে তোলে। এর আগে উড়োজাহাজটি সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রাবিরতি করে ঢাকার পথে রওয়ানা দিয়েছিল।
বিকেলে বিমানবন্দর এলাকা থেকে সরাসরি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পর তারেক রহমান তার প্রথম লক্ষ্য স্থির করেন মায়ের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেওয়া। সন্ধ্যা ৫টা ৫২ মিনিটে তিনি এভারকেয়ার হাসপাতালে পৌঁছান। তার পৌঁছানোর কিছুক্ষণ আগেই ডা. জুবাইদা রহমান ও জাইমা রহমান হাসপাতালে প্রবেশ করেন। তারেক রহমানকে বহনকারী বাসটি হাসপাতাল গেটে পৌঁছালে তিনি সেখান থেকে নেমে হেঁটে ভেতরে প্রবেশ করেন, যা তার দীর্ঘ সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
হাসপাতালের ভেতরে অসুস্থ মা বেগম খালেদা জিয়ার শয্যাপাশে তিনি প্রায় দেড় ঘণ্টা সময় অতিবাহিত করেন। গত কয়েক বছর ধরে বেগম জিয়া নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে এই হাসপাতালেই চিকিৎসাধীন রয়েছেন। মা ও ছেলের এই দীর্ঘ সতেরো বছরের শারীরিক দূরত্বের অবসান ঘটার সময়টি ছিল অত্যন্ত ব্যক্তিগত ও স্পর্শকাতর। পরিবারের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানিয়েছে, দীর্ঘদিন পর ছেলেকে কাছে পেয়ে বেগম জিয়াও আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন।
হাসপাতালে যাওয়ার আগে বিকেলে এক সংক্ষিপ্ত গণসংবর্ধনায় তারেক রহমান দেশবাসীর উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন। তার কণ্ঠে ছিল একদিকে সন্তানের আকুতি, অন্যদিকে দেশপ্রেমের অঙ্গীকার। তিনি বলেন, “সন্তান হিসেবে আমার মন আজ আমার অসুস্থ মায়ের শয্যাপাশে পড়ে আছে। কিন্তু এই মানুষটি (খালেদা জিয়া) যাদের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন, সেই আপনাদের আমি ফেলে যেতে পারি না। আপনাদের ভালোবাসা ও ত্যাগ আমাকে আজ এই মাটির কোলে ফিরিয়ে এনেছে।”
তিনি আরও যোগ করেন যে, আজ তিনি যেখানে দাঁড়িয়ে আছেন, তা সম্ভব হয়েছে দেশের সাধারণ মানুষের অপরিসীম ধৈর্য ও রাজনৈতিক লড়াইয়ের কারণে। তার এই বক্তব্য টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোটি মানুষের হৃদয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
সকাল থেকেই এভারকেয়ার হাসপাতাল এলাকায় ভিড় জমাতে শুরু করেন বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের হাজার হাজার নেতাকর্মী। তারা ব্যানার, ফেস্টুন ও দলীয় পতাকা নিয়ে নেতার অপেক্ষায় প্রহর গুনতে থাকেন। দলের পক্ষ থেকে হাসপাতালের শান্তি বজায় রাখতে স্লোগান দিতে নিষেধ করা হলেও, তারেক রহমানকে দেখা মাত্রই কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা ও উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার মধ্যেও নেতাকর্মীরা প্রিয় নেতার উপস্থিতিকে স্বাগত জানান।
তারেক রহমানের এই প্রত্যাবর্তন কেবল একটি দলের নেতৃত্বের সংকট কাটানো নয়, বরং দেশের সামগ্রিক রাজনীতিতে এক নতুন ভারসাম্য তৈরি করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। দীর্ঘ নির্বাসন শেষে তার এই ফিরে আসা এবং মায়ের সঙ্গে সাক্ষাতের মধ্য দিয়ে বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ে যে নতুন উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে, তা আগামীর রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রাত পৌনে আটটায় হাসপাতাল ত্যাগ করে যখন তিনি গুলশানের বাসভবনের দিকে যাচ্ছিলেন, তখন পুরো রাস্তায় তার গাড়িবহরকে ঘিরে ছিল উৎসুক জনতা ও অনুসারীদের দীর্ঘ মিছিল। একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক নির্বাসনের সমাপ্তি ঘটিয়ে তারেক রহমান এখন দেশের মাটিতে নতুন রাজনৈতিক যাত্রার সূচনা করতে প্রস্তুত।

