রাজধানী ঢাকার অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এবং বৃহৎ বস্তি এলাকা কড়াইলে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পেছনের কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র উদঘাটনে পাঁচ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর। এই মর্মান্তিক ঘটনাটি কেবল একটি সাধারণ দুর্ঘটনা নাকি এর নেপথ্যে অন্য কোনো কারণ রয়েছে, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখবে এই বিশেষায়িত কমিটি।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নবগঠিত এই তদন্ত কমিটিকে আগামী পনেরো (১৫) কার্যদিবসের মধ্যে তাদের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিল করার জন্য সুনির্দিষ্টভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বস্তির হাজার হাজার ছিন্নমূল মানুষের জীবনের নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতের সরকারি নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে এই প্রতিবেদনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করা হচ্ছে। অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত, আগুনের তীব্রতা বৃদ্ধির কারণ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের পদক্ষেপের যথার্থতা—প্রতিবেদনে এই সমস্ত দিকের বিশ্লেষণ আশা করা হচ্ছে।
বুধবার (২৬ নভেম্বর) ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মিডিয়া কর্মকর্তা শাহজাহান শিকদার এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি সংবাদমাধ্যমকে জানান, দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঘটনার পেছনের সত্য উন্মোচন করা এবং ভবিষ্যতে এমন বিপর্যয় রোধে সুপারিশ প্রদানের লক্ষ্যেই এই জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, কড়াইল বস্তির মতো ঝুঁকিপূর্ণ বসতিগুলোতে অগ্নি-নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সর্বদা সজাগ দৃষ্টি রাখা হয়, তবে এই বিশেষ ক্ষেত্রে কোনো ত্রুটি ছিল কিনা, তা বিশদভাবে খতিয়ে দেখা হবে।
গঠিত তদন্ত কমিটিটির নেতৃত্বে রয়েছেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপ-পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) জনাব মো. মামুনুর রশিদ। তাঁর অভিজ্ঞতা ও পেশাদারিত্ব এই জটিল তদন্ত প্রক্রিয়াকে সঠিক পথে চালিত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কমিটির অন্যান্য সদস্যবৃন্দ প্রত্যেকেই ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের গুরুত্বপূর্ণ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তা। তাঁরা হলেন:
১. সহকারী পরিচালক কাজী নজমুজ্জামান: তিনি তদন্তের সার্বিক প্রক্রিয়া ও কারিগরি দিকগুলো তত্ত্বাবধান করবেন। ২. উপ-সহকারী পরিচালক অতীশ চাকমা: ঢাকা জোন-২ এর এই কর্মকর্তা বস্তি এলাকার ভৌগোলিক ও কার্যনির্বাহী চ্যালেঞ্জগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন। ৩. সিনিয়র স্টেশন অফিসার মো. নাজিম উদ্দিন (তেজগাঁও): অগ্নিনির্বাপণ প্রক্রিয়ায় সরাসরি অংশ নেওয়া ইউনিটের একজন প্রতিনিধি হিসেবে তিনি ঘটনাস্থলের অভিজ্ঞতা ও প্রথমিক প্রমাণাদি সংগ্রহে সহায়তা করবেন। ৪. ওয়ার হাউস ইন্সপেক্টর মো. সোহরাব হোসেন (ঢাকা-২৩): তিনি মূলত অগ্নি-নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও অবকাঠামোগত দিকগুলোর মান এবং ব্যবহারের অবস্থা যাচাইয়ের দায়িত্বে থাকবেন।
এই বহুমুখী সদস্য নির্বাচন ইঙ্গিত দেয় যে তদন্তটি কেবল আগুনের কারণ উদঘাটনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং অগ্নি-নিরাপত্তা ব্যবস্থার সামগ্রিক দুর্বলতাগুলোও চিহ্নিত করবে।
বস্তির অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা বাংলাদেশে প্রায়শই ঘটে থাকে এবং প্রতিবারই দরিদ্র ও নিম্ন-আয়ের মানুষের জীবন-জীবিকা ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। কড়াইল বস্তির এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা নতুন করে হাজার হাজার মানুষকে গৃহহীন করেছে, যা জনমনে চরম উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ঘনবসতি, অপরিকল্পিত বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ এবং সহজে দাহ্য বস্তুর ব্যবহার এই ধরনের বিপর্যয়কে আরও মারাত্মক করে তোলে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা শহরের বস্তিগুলোর ঝুঁকিপূর্ণ জীবনযাত্রার মান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন। ফায়ার সার্ভিসের এই তদন্ত কমিটি এখন যে প্রতিবেদন দেবে, তা কেবল দুর্ঘটনার কারণ নির্ণয়ের দলিল হবে না, বরং বস্তি উন্নয়ন ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় সরকারের ভবিষ্যৎ পদক্ষেপের জন্য একটি দিকনির্দেশক নথি হিসেবেও বিবেচিত হবে। বস্তিবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারকে দীর্ঘমেয়াদী, মানবিক ও টেকসই সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে হবে।
এই কমিটি গঠিত হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত বস্তিবাসীর মনে আশার সঞ্চার হয়েছে। তারা আশা করছেন, তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ উন্মোচিত হবে এবং দোষীদের চিহ্নিত করা হবে। পাশাপাশি, ভবিষ্যতে যেন আর কোনো মানুষ এমন মর্মান্তিক পরিস্থিতির শিকার না হয়, তার জন্য কঠিন ও কার্যকর সুপারিশগুলো সরকারের কাছে পেশ করা হবে। রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল সংস্থা হিসেবে ফায়ার সার্ভিসের এই পেশাদার উদ্যোগ দেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে এক নতুন মাত্রা যোগ করবে। এই তদন্ত প্রতিবেদনে কী ধরনের সুপারিশ উঠে আসে, সেদিকেই এখন সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ।

