দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে আজ নিজ জন্মভূমিতে পা রেখেছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার (২৫ ডিসেম্বর) বিকেলে রাজধানীর পূর্বাচল সংলগ্ন ৩০০ ফিট সড়কের (৩৬ জুলাই এক্সপ্রেসওয়ে) সুবিশাল গণসংবর্ধনা মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি দেশবাসীর উদ্দেশ্যে তার প্রথম ভাষণ প্রদান করেন। লক্ষ লক্ষ নেতাকর্মীর হর্ষধ্বনি আর গগনবিদারী স্লোগানের মধ্য দিয়ে দেওয়া এই বক্তৃতায় তারেক রহমান অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “প্রথমেই রাব্বুল আলামিনের প্রতি শুকরিয়া আদায় করছি। জনগণের দোয়ায় ও আল্লাহর অশেষ রহমতে আমি আমার প্রিয় মাতৃভূমিতে ফিরে আসতে পেরেছি।”
বিকেল ৩টা ৫০ মিনিটে যখন তিনি মঞ্চে আরোহণ করেন, তখন পুরো এলাকা এক ঐতিহাসিক জনসমুদ্রে রূপ নেয়। নেতাকর্মীদের ভালোবাসায় সিক্ত তারেক রহমান তার বক্তব্যে বাংলাদেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক সংগ্রামের স্মৃতি চারণ করেন। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে যে মহান স্বাধীনতার স্বপ্ন নিয়ে লাখো শহীদ রক্ত দিয়েছিলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সেই স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে দ্বিতীয়বারের মতো রক্ষা করা হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, দেশের কৃষক-শ্রমিক, নারী-পুরুষ এবং মাদ্রাসার ছাত্রসহ সর্বস্তরের মানুষ দল-মত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ হয়ে স্বৈরাচারের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করেছে।
তারেক রহমান তার ভাষণে একটি আধুনিক ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনের রূপরেখা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “আমরা সবাই মিলে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই, যে বাংলাদেশের স্বপ্ন একজন মা দেখেন। অর্থাৎ, একটি নিরাপদ বাংলাদেশ আমাদের লক্ষ্য; যেখানে একজন নারী, পুরুষ বা শিশু নিরাপদে ঘর থেকে বের হয়ে আবার নিরাপদে ঘরে ফিরে আসতে পারবে।” তিনি পাহাড় ও সমতলের মানুষের বৈচিত্র্য এবং হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সম্প্রীতির ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, বাংলাদেশের মানুষ এখন কেবল কথা বলার অধিকারই নয়, বরং যোগ্যতা অনুযায়ী তাদের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করতে চায়।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি দেশের ভবিষ্যৎ শক্তি হিসেবে তরুণ প্রজন্ম ও নারীদের অবদানের কথা স্মরণ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, দেশের চার কোটির বেশি তরুণ, পাঁচ কোটির মতো শিশু এবং বিপুল সংখ্যক কৃষক-শ্রমিকের রাষ্ট্রের প্রতি বিশাল আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। বিগত ১৫ বছরে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে যারা গুম ও খুনের শিকার হয়েছেন, তাদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে তারেক রহমান বলেন, তাদের সেই স্বপ্ন পূরণে ইনশাআল্লাহ আমরা সক্ষম হব।
বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার পর থেকে সংবর্ধনাস্থল পর্যন্ত পুরো পথেই ছিল মানুষের ঢল। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের শীর্ষ নেতারা তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বরণ করে নেন। দীর্ঘ দেড় যুগের নির্বাসনের ক্লান্তি ভুলে তারেক রহমান যেভাবে বাংলার মাটির টানে ফিরে এসেছেন, তা কেবল তার দলের জন্যই নয়, বরং দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রেও এক বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠান শেষে তারেক রহমান সরাসরি রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তার মা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাথে দেখা করতে যান। মা ও ছেলের এই পুনর্মিলনকে ঘিরে নেতাকর্মীদের মাঝে ব্যাপক আবেগ ও চাঞ্চল্য বিরাজ করছে। এরপর তিনি গুলশানে তার নির্ধারিত বাসভবনে পৌঁছাবেন। আজকের এই কর্মসূচির মধ্য দিয়ে তারেক রহমান কেবল দেশেই ফিরলেন না, বরং বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন আশার সূচনা করলেন।

