দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে মাতৃভূমির মাটিতে পা রেখেই এক নতুন ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর পূর্বাচল সংলগ্ন ৩০০ ফিট সড়কের (৩৬ জুলাই এক্সপ্রেসওয়ে) বিশাল গণসংবর্ধনা মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি দেশবাসীর উদ্দেশ্যে তার বহুল প্রতীক্ষিত ভাষণ প্রদান করেন।
লক্ষ লক্ষ নেতাকর্মীর উপস্থিতিতে আয়োজিত এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তারেক রহমান বলেন, “আমরা সবাই মিলে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলব, যা একজন মা দেখেন। অর্থাৎ, একটি নিরাপদ বাংলাদেশ আমরা গড়তে চাই, যেখানে একজন মানুষ নিশ্চিন্তে ঘর থেকে বের হতে পারবে এবং নিরাপদে ঘরে ফিরে আসতে পারবে।”
বিকেল ৩টা ৫০ মিনিটে যখন তারেক রহমান সংবর্ধনা মঞ্চে আরোহণ করেন, তখন পুরো এলাকা মুহুর্মুহু স্লোগান ও করতালিতে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর প্রিয় নেতাকে সামনে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন উপস্থিত জনতা। বক্তব্যের শুরুতে তিনি মহান আল্লাহর প্রতি গভীর শুকরিয়া আদায় করে বলেন, “রাব্বুল আলামিনের অশেষ রহমতে এবং আপনাদের দোয়ায় আজ আমি প্রিয় জন্মভূমিতে ফিরে আসতে পেরেছি।”
তিনি ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা এবং ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানকে একসূত্রে গেঁথে উল্লেখ করেন যে, এ দেশের মানুষ বারবার নিজেদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করেছে এবং এখন সময় এসেছে গণতন্ত্র ও কথা বলার অধিকার স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা করার।
তারেক রহমান তার ভাষণে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের চিত্র তুলে ধরেন, যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার থাকবে। তিনি বলেন, “এ দেশে পাহাড় ও সমতলের মানুষ রয়েছে; মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানসহ সব ধর্মের মানুষ আমাদের ভাই।
আমরা এমন একটি রাষ্ট্র চাই যেখানে নারী, পুরুষ বা শিশু—যেই হোক না কেন, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকবে।” দেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ নারী, তরুণ এবং শিশুদের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই বিশাল জনগোষ্ঠীর রাষ্ট্রের কাছে অনেক প্রত্যাশা রয়েছে এবং তরুণ প্রজন্মই আগামী দিনে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর দেশকে দাঁড়িয়ে করাবে।
শান্তি ও স্থিতিশীলতার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে বিএনপি প্রধান তার বক্তব্যে পরপর তিনবার ঘোষণা করেন—‘আমরা দেশের শান্তি চাই’। তিনি কোনো ধরনের প্রতিশোধ বা বিভাজনের রাজনীতির পরিবর্তে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ পুনর্গঠনের আহ্বান জানান।
তারেক রহমানের মতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সর্বস্তরের মানুষ দল-মত নির্বিশেষে যেভাবে রাজপথে নেমেছিল, সেই একই ঐক্য এখন দেশ গড়ার কাজে প্রয়োজন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন যে, বাংলাদেশের মানুষ এখন কেবল একটি ভোট দেওয়ার অধিকারই নয়, বরং তাদের প্রতিটি ন্যায্য পাওনা এবং যোগ্যতা অনুযায়ী অধিকার ফিরে পেতে চায়।
গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দলের পক্ষ থেকে তারেক রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে বরণ করে নেন। মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যসহ যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর শীর্ষ নেতৃবৃন্দ।
বিমানবন্দর থেকে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টার দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সংবর্ধনাস্থলে পৌঁছানোর সময় রাস্তার দুই পাশে দাঁড়ানো লাখো মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হন তিনি। উল্লেখ্য যে, লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দর থেকে রওনা হয়ে আজ বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে তিনি সপরিবারে ঢাকায় অবতরণ করেন।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠান শেষে তারেক রহমান সরাসরি রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তার মা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাথে দেখা করতে যান। দীর্ঘ দেড় যুগের বিচ্ছেদ শেষে মা-ছেলের এই পুনর্মিলন নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক আবেগ কাজ করছে।
হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে তিনি গুলশানের বাসভবনে যাওয়ার কথা রয়েছে। তারেক রহমানের এই প্রত্যাবর্তন এবং প্রথম জনসভায় দেওয়া ‘নিরাপদ বাংলাদেশের’ বার্তা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নতুন মেরুকরণ ও আশার সঞ্চার করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

