দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে নিজ জন্মভূমিতে ফিরেছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আজ বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে তাকে বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিশেষ ফ্লাইটটি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। তার এই প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকা জুড়ে এক ঐতিহাসিক ও আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
বিমানবন্দরের সিআইপি গেটে অবতরণের পর ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ভিআইপি লাউঞ্জে প্রবেশ করেন তারেক রহমান। সেখানে তাকে স্বাগত জানাতে আগে থেকেই উপস্থিত ছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্যরা। দীর্ঘ দেড় যুগের বিচ্ছেদ শেষে প্রিয় নেতাকে কাছে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন দলীয় শীর্ষ নেতারা।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানোর পর তারেক রহমান একে একে স্থায়ী কমিটির সদস্যদের সঙ্গে আলিঙ্গন ও কুশল বিনিময় করেন। এরপর সেখানে এক অত্যন্ত আবেগঘন মুহূর্তের সৃষ্টি হয় যখন তার শাশুড়ি সৈয়দা ইকবাল মান্দ বানু তাকে গোপাল ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নেন। এ সময় তার পাশে ছিলেন স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান এবং কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমান।
বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার সময় এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয়। দীর্ঘ ৬ হাজার ৩১৪ দিন পর দেশের মাটিতে পা রেখেই তারেক রহমান তার জুতা খুলে ফেলেন। খালি পায়ে মাতৃভূমির মাটি স্পর্শ করে তিনি পরম মমতায় এক মুঠো মাটি হাতে তুলে নেন এবং কপালে ছোঁয়ান।
প্রিয় স্বদেশের মাটির স্পর্শে তিনি এ সময় দৃশ্যত আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। তার এই দেশপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ সেখানে উপস্থিত হাজার হাজার নেতাকর্মীর মাঝে এক অন্যরকম উদ্দীপনার সৃষ্টি করে। এরপর তিনি হাত নেড়ে রাস্তার দুই পাশে অপেক্ষমাণ জনতার অভিবাদনের জবাব দেন।
বিমানবন্দর থেকে তারেক রহমানকে বহন করার জন্য বিশেষ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। লাল-সবুজ রঙে সজ্জিত একটি বিশেষ বুলেটপ্রুফ বাসে করে তিনি বিমানবন্দর এলাকা ত্যাগ করেন। বাসটির গায়ে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রতিকৃতি সম্বলিত ব্যানার এবং ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানটি শোভা পাচ্ছিল। বিমানবন্দর থেকে ৩০০ ফিট সড়কের (৩৬ জুলাই এক্সপ্রেসওয়ে) দিকে রওনা হওয়ার সময় রাস্তার দুই পাশে অপেক্ষমাণ লক্ষাধিক নেতাকর্মীর স্লোগান ও ভালোবাসায় সিক্ত হন তিনি।
বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিমানবন্দর থেকে সরাসরি তিনি ৩০০ ফিট এলাকায় আয়োজিত এক সংক্ষিপ্ত গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। সেখানে উপস্থিত লক্ষ লক্ষ নেতাকর্মী ও দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে তার। এরপর তিনি সরাসরি রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে যাবেন, যেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন তার মা এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া।
দীর্ঘ বছর পর মা ও ছেলের এই পুনর্মিলনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে এবং সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক কৌতূহল বিরাজ করছে। হাসপাতাল থেকে তিনি গুলশানের বাসভবন ‘ফিরোজা’র পাশের নিজস্ব বাসভবনে যাবেন।
তারেক রহমানের এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে স্মরণীয় করে রাখতে রাজধানী জুড়ে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। পুলিশ, র্যাব, বিজিবি এবং সেনাবাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন পয়েন্টে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। বিশেষ করে বিমানবন্দর থেকে ৩০০ ফিট এবং গুলশান এলাকা পর্যন্ত নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বেষ্টনী গড়ে তোলা হয়েছে।
বিএনপি নেতৃবৃন্দ জানিয়েছেন, ২০০৮ সালে চিকিৎসার জন্য লন্ডন যাওয়ার পর আজ তার ফিরে আসা দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষের জন্য এক বিশাল বিজয়। এই ফেরার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন ইতিবাচক ধারার সূচনা হবে বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সংবর্ধনাস্থল ৩০০ ফিট এলাকায় এখন তিল ধারণের ঠাঁই নেই। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষ তাদের প্রিয় নেতাকে একনজর দেখার জন্য সকাল থেকেই সেখানে ভিড় জমিয়েছেন। তারেক রহমানের এই প্রত্যাবর্তন কেবল একটি রাজনৈতিক দলের নেতার দেশে ফেরা নয়, বরং এটি বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

