দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনের গ্লানি মুছে অবশেষে প্রিয় মাতৃভূমির মাটিতে পা রাখলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আজ বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা ৩৬ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তিনি সংবর্ধনাস্থলের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। দীর্ঘ ৬ হাজার ৩১৪ দিন পর তার এই প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকা আজ এক অনন্য ও ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে রইল।
বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে যখন তিনি বহির্গমন গেট দিয়ে বেরিয়ে আসেন, তখন সেখানে এক অভূতপূর্ব ও আবেগঘন দৃশ্যের অবতারণা হয়। বাসে ওঠার ঠিক আগ মুহূর্তে তারেক রহমান হঠাৎ থমকে দাঁড়ান এবং নিজের জুতা খুলে খালি পায়ে বাংলার মাটি স্পর্শ করেন।
পরম মমতায় এক মুঠো মাটি হাতে নিয়ে তিনি কপালে ঠেকান এবং দীর্ঘক্ষণ সিজদাবনত হয়ে থাকেন। মাতৃভূমির প্রতি এমন অকৃত্রিম ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার দৃশ্য দেখে উপস্থিত হাজার হাজার নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের চোখে আনন্দের অশ্রু বয়ে যায়। মুহুর্মুহু স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে গোটা বিমানবন্দর এলাকা।
এর আগে বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে তারেক রহমান, তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান এবং কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমানকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান বিএনপির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ। দলীয় মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সেলিমা রহমান, সালাহউদ্দিন আহমেদ, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন এবং ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুসহ জ্যেষ্ঠ নেতারা তাকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান। দীর্ঘ দেড় যুগ পর প্রিয় নেতাকে কাছে পেয়ে অনেক প্রবীণ নেতাকেও আবেগাপ্লুত হতে দেখা যায়।
বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার পর তারেক রহমান লাল-সবুজ রঙে সজ্জিত একটি বিশেষ বুলেটপ্রুফ বাসে আরোহণ করেন। বাসটির শরীর জুড়ে শোভা পাচ্ছিল মহান স্বাধীনতার ঘোষক ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানের প্রতিকৃতি। বাসের গায়ে বড় অক্ষরে লেখা ছিল ‘সবার আগে বাংলাদেশ’—যা দলটির বর্তমান রাজনৈতিক দর্শনের মূল ভিত্তি হিসেবে পরিচিত।
বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার সময় রাস্তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লক্ষ লক্ষ মানুষ হাত নেড়ে তাদের প্রিয় নেতাকে স্বাগত জানান। নেতাকর্মীদের হাতে ছিল জাতীয় পতাকা, দলীয় ব্যানার এবং তারেক রহমানের ছবি সম্বলিত অসংখ্য প্ল্যাকার্ড।
তারেক রহমানের এই যাত্রা এখন অগ্রসর হচ্ছে ৩৬ জুলাই এক্সপ্রেসওয়ে বা বহুল পরিচিত ৩০০ ফিট সড়কের দিকে। সেখানে আয়োজিত এক বিশাল গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেবেন এবং দেশবাসীর প্রতি তার দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত আবেগ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবেন।
এরপর তিনি সরাসরি রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে যাবেন, যেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন তার মা ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। দীর্ঘ বছর পর মা ও ছেলের এই পুনর্মিলন কেবল পরিবারের জন্য নয়, বরং গোটা দলের কর্মীদের জন্য এক পরম আকাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত।
নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে নজিরবিহীন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। বিমানবন্দর থেকে শুরু করে তার যাতায়াতের প্রতিটি মোড়ে পুলিশ, র্যাব ও বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। এছাড়া কয়েক হাজার প্রশিক্ষিত দলীয় স্বেচ্ছাসেবক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কাজ করে যাচ্ছেন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোও তারেক রহমানের এই প্রত্যাবর্তনকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে প্রচার করছে, যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন মোড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিকেল নাগাদ সংবর্ধনা অনুষ্ঠান শেষ করে তিনি গুলশানে তার মায়ের বাসভবন ‘ফিরোজা’র পাশের নির্ধারিত বাসভবনে পৌঁছাবেন বলে দলীয় সূত্রে জানানো হয়েছে। তার এই ফিরে আসা কেবল একটি রাজনৈতিক দলের জন্য নয়, বরং দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষের মাঝে এক নতুন আশার আলো সঞ্চার করেছে। দীর্ঘ নির্বাসনের ক্লান্তি ভুলে তারেক রহমান যেভাবে বাংলার মাটিতে মিশে যাওয়ার সংকল্প ব্যক্ত করেছেন, তা আগামী দিনের রাজনীতিতে এক গভীর প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

