দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে স্বদেশের মাটিতে পা রেখেই এক তাৎপর্যপূর্ণ সৌজন্যে মেতে উঠলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের পরপরই তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন। দেশের দুই শীর্ষ ব্যক্তিত্বের এই ফোনালাপ বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্ববহ এবং ইতিবাচক পরিবর্তনের সংকেত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
বিএনপি দলীয় সূত্র জানায়, তারেক রহমান বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর এবং উপস্থিত দলীয় নেতাদের সংবর্ধনা গ্রহণের ফাঁকেই প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে এই আলাপচারিতা সারেন। সংক্ষিপ্ত এই ফোনালাপে তারেক রহমান তার নিরাপদ প্রত্যাবর্তনে সরকারের সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ জানান। একই সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসও তারেক রহমানকে সপরিবারে দেশে ফিরে আসায় আন্তরিক স্বাগত জানান এবং তার সুস্থতা কামনা করেন। এই কথোপকথনটি অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে বলে জানা গেছে।
এর আগে দুপুর ১২টা ৩৬ মিনিটে তারেক রহমান বিমানবন্দর ত্যাগ করেন। তবে বাসভবনের উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে বিমানবন্দরের বহির্গমন গেটে এক আবেগঘন মুহূর্তের সাক্ষী হন উপস্থিত জনতা। বাসে ওঠার ঠিক আগ মুহূর্তে তিনি তার জুতা খুলে ফেলেন এবং খালি পায়ে বাংলার পবিত্র মাটি স্পর্শ করেন।
এ সময় তিনি নিচু হয়ে এক মুঠো মাটি হাতে নিয়ে পরম মমতায় কপালে ছোঁয়ান এবং কিছুক্ষণ সিজদাবনত অবস্থায় অবস্থান করেন। তার এই দেশপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ সেখানে উপস্থিত হাজার হাজার নেতাকর্মীর মাঝে এক অন্যরকম আবেগ ও উদ্দীপনার সৃষ্টি করে। দীর্ঘ ৬ হাজার ৩১৪ দিন পর মাতৃভূমির মাটির ছোঁয়া পেয়ে তিনি দৃশ্যত অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন।
বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে তারেক রহমানকে বরণ করে নিতে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির একঝাঁক শীর্ষ নেতা। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে সেখানে উপস্থিত ছিলেন মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সেলিমা রহমান, সালাহউদ্দিন আহমেদ, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন এবং ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
প্রিয় নেতাকে সামনে পেয়ে তারা একে একে তাকে ফুলের শুভেচ্ছা জানান এবং আলিঙ্গন করেন। এ সময় তারেক রহমানের সঙ্গে তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান এবং কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমানকেও দলের পক্ষ থেকে সাদর অভ্যর্থনা জানানো হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের দেশে ফেরার পর প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে এই তাৎক্ষণিক ফোনালাপ দেশের আগামী দিনের রাজনীতিতে একটি ভারসাম্যপূর্ণ এবং স্থিতিশীল পরিবেশের ইঙ্গিত দেয়। দীর্ঘ নির্বাসনের পর তার এই সক্রিয় প্রত্যাবর্তন এবং সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়ায় একটি নতুন মাইলফলক হতে পারে। বিমানবন্দর থেকে তারেক রহমান এখন পূর্বনির্ধারিত সংবর্ধনা কর্মসূচির উদ্দেশ্যে ৩০০ ফিট এলাকার দিকে এগোচ্ছেন, যেখানে লক্ষাধিক মানুষ তাদের নেতার ভাষণ শোনার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠান শেষে তারেক রহমানের সরাসরি এভারকেয়ার হাসপাতালে যাওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে তিনি তার অসুস্থ মা বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেবেন এবং দীর্ঘ সময় পর তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। এরপর তিনি গুলশানের বাসভবনে ফিরবেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে তার পুরো যাতায়াতের পথে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। আজকের এই দিনটি বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

