দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে নিজ জন্মভূমিতে প্রত্যাবর্তন করেছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের পর এক আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
বিমানবন্দর থেকে বেরিয়েই তিনি বাংলার মাটি স্পর্শ করে সিজদাবনত হন এবং দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তার এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকা জুড়ে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে এবং লক্ষাধিক নেতাকর্মীর উপস্থিতিতে এক বিশাল গণসংবর্ধনার আয়োজন করা হয়েছে।
বিমানবন্দরের ভিআইপি টার্মিনাল দিয়ে বেরিয়ে আসার পর তারেক রহমানকে এক নজর দেখার জন্য হাজার হাজার নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ ভিড় জমান। কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তিনি যখন বাইরে আসেন, তখন চারদিকে মুহুর্মুহু স্লোগান ও করতালিতে মুখরিত হয়ে ওঠে বিমানবন্দর এলাকা। বিএনপির মিডিয়া সেলের সরাসরি সম্প্রচারিত ভিডিওতে দেখা যায়, দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই ক্ষণে তারেক রহমান অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন।
টার্মিনালের বহির্গমন গেটে পা রাখামাত্রই তিনি অবনত হয়ে দুহাত দিয়ে মাটি স্পর্শ করেন এবং গভীর শ্রদ্ধাভরে নিজ মাতৃভূমির মাটিকে কপালে ছোঁয়ান। এরপর তিনি জুতা খুলে কিছুক্ষণ খালি পায়ে মাটির ওপর দাঁড়িয়ে থাকেন, যা উপস্থিত জনতাকে গভীরভাবে স্পর্শ করে। এই দৃশ্যটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং দলের সমর্থকদের মাঝে নতুন প্রাণচাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে।
বিমানবন্দর থেকে তারেক রহমানকে বহন করার জন্য বিশেষ একটি বাসের ব্যবস্থা করা হয়। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান সংবলিত এই সুসজ্জিত বাসে চেপেই তিনি বিমানবন্দর থেকে ৩০০ ফিট সংবর্ধনাস্থলের দিকে রওনা হন। বাসটির ছাদ খোলা না থাকলেও সামনের কাঁচের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে তিনি রাস্তার দুই ধারে অপেক্ষমাণ হাজার হাজার নেতাকর্মীর উদ্দেশ্যে হাত নাড়েন এবং অভিবাদনের জবাব দেন।
পুরো যাত্রাপথ জুড়ে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর নজরদারি ও বিশেষ নিরাপত্তা বেষ্টনী নিশ্চিত করা হয়। বাসের চারপাশ ঘিরে মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা ও নেতাকর্মীদের মিছিলের কারণে বিমানবন্দর থেকে ৩০০ ফিট পর্যন্ত দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হলেও মানুষের মাঝে ছিল প্রবল উদ্দীপনা।
তারেক রহমানের এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিগত প্রায় দুই দশক ধরে লন্ডনে অবস্থান করে তিনি দূর থেকেই দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিলেন। আইনি জটিলতা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তার দেশে ফেরা বারবার বিলম্বিত হলেও, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন তার ফেরার পথ সুগম করে।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা মনে করছেন, তারেক রহমানের প্রত্যক্ষ উপস্থিতিতে দল আরও শক্তিশালী হবে এবং দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় এক নতুন মাত্রা যোগ হবে। তৃণমূলের কর্মীদের মাঝে তার এই ফেরা হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে এনেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
বিমানবন্দর থেকে ৩০০ ফিট সংবর্ধনাস্থল পর্যন্ত পুরো রাস্তা তোরণ, ব্যানার ও ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নেতাকর্মীরা বাসে, ট্রাকে এবং ট্রেনে করে ঢাকায় সমবেত হয়েছেন তাদের প্রিয় নেতাকে বরণ করে নিতে। সংবর্ধনা মঞ্চে পৌঁছানোর পর তারেক রহমান জাতির উদ্দেশ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এই ভাষণে তিনি দেশের বর্তমান পরিস্থিতি, দলের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা এবং জাতীয় ঐক্যের ডাক দিতে পারেন বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা। দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এটি কেবল একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, বরং দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত আবেগের বহিঃপ্রকাশ।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর মতে, তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও মানবাধিকার রক্ষার লড়াইয়ে তার এই সক্রিয় অংশগ্রহণ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য আনবে বলে অনেকে মনে করছেন।
দীর্ঘ নির্বাসনের ক্লান্তি ভুলে তিনি যেভাবে মাটির টানে ফিরে এসেছেন, তা কেবল তার দলের কর্মীদের জন্যই নয়, বরং দেশের সাধারণ মানুষের মাঝেও এক ধরনের কৌতূহল ও আশার সঞ্চার করেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জনসমাগম নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে অতিরিক্ত পুলিশ ও বিশেষ বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়ার পথে তারেক রহমান বারবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ছিলেন। দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে থাকলেও দেশের প্রতি তার নাড়ির টান যে বিন্দুমাত্র কমেনি, তা তার প্রতিটি আচরণে প্রকাশ পাচ্ছিল। বাসের জানালা দিয়ে তিনি যখন মানুষের ভালোবাসা গ্রহণ করছিলেন, তখন অনেকের চোখেই ছিল আনন্দের অশ্রু। দলীয় সূত্রে জানানো হয়েছে, আজ বিকেলের সংবর্ধনা শেষে তিনি সরাসরি শেরেবাংলা নগরে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও তার পিতা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মাজার জিয়ারত করবেন। এরপর তিনি তার বাসভবনে যাবেন, যেখানে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একান্ত সময় কাটানোর কথা রয়েছে।
তারেক রহমানের এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তন কেবল বিএনপির জন্য নয়, বরং দেশের সামগ্রিক রাজনীতির জন্য এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর তার এই ফিরে আসা সাধারণ মানুষের মনে যেমন আশার আলো দেখাচ্ছে, তেমনি রাজনৈতিক অঙ্গনে তৈরি করছে নতুন মেরুকরণের সম্ভাবনা।
দেশজুড়ে চলমান এই উৎসবমুখর পরিবেশ প্রমাণ করে যে, রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি জনমানুষের আস্থা ও ভালোবাসা এখনও অমলিন। আগামী দিনগুলোতে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি কোন পথে এগোবে এবং দেশের রাজনীতিতে কী ধরনের গুণগত পরিবর্তন আসবে, তা দেখার অপেক্ষায় এখন পুরো জাতি।

