মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দু ইয়েমেনের পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। আঞ্চলিক পরাশক্তি সৌদি আরবের প্রকাশ্য হুঁশিয়ারি ও রক্তচক্ষুকে পরোয়া না করে দেশটির কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশ হাদরামাউতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করছে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল (এসটিসি)।
সোমবার (২২ ডিসেম্বর) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ইয়েনি সাফাকের এক বিশেষ প্রতিবেদনে দক্ষিণ ইয়েমেনের এই ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার চিত্র ফুটে উঠেছে। ইয়েমেনের অখণ্ডতা রক্ষা এবং বিচ্ছিন্নতাবাদ দমনে রিয়াদের প্রচেষ্টাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এসটিসির এই অবস্থান দেশটিকে আবারও ১৯৯০ সালের আগের সেই দ্বিখণ্ডিত পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে হাদরামাউত প্রদেশটি ইয়েমেনের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি দেশটির বৃহত্তম প্রদেশ এবং তেল ও প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ। প্রায় তিন সপ্তাহ আগে এক আকস্মিক ও তীব্র সামরিক অভিযানের মাধ্যমে সৌদি সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থিত এই প্রদেশের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে এসটিসি।
উল্লেখ্য যে, ১৯৯০ সালে উত্তর ও দক্ষিণ ইয়েমেন একত্রিত হওয়ার আগে এই অঞ্চলটি একটি স্বাধীন রাষ্ট্র ছিল। বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাত সমর্থিত এসটিসি যোদ্ধারা আবারও সেই পুরনো মানচিত্র ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে কাজ করছে, যার প্রধান লক্ষ্য হলো দক্ষিণ ইয়েমেনকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
এসটিসির জাতীয় পরিষদের প্রধান আলী আল-খাতিরি এক ভিডিও বার্তায় দাবি করেছেন যে, গত ৩ ডিসেম্বর তারা হাদরামাউতের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকে সেখানে অভাবনীয় স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে। তার মতে, সশস্ত্র তৎপরতা বন্ধ এবং অবৈধ অস্ত্রের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের ফলে স্থানীয় জনগণের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটছে। গোষ্ঠীটি দাবি করছে যে তারা কোনো বেসামরিক মানুষকে হেনস্তা করছে না এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনছে। তবে এসটিসি নেতাদের এই দাবির বিপরীতে মানবাধিকার সংস্থাগুলো এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে।
ইয়েমেনি নেটওয়ার্ক ফর রাইটস অ্যান্ড ফ্রিডম নামক মানবাধিকার সংস্থার তথ্যানুযায়ী, এসটিসির নিয়ন্ত্রণে আসার পর হাদরামাউতে ব্যাপক ধরপাকড় ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে। অন্তত ৩১২ জন বেসামরিক নাগরিককে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই আটক করা হয়েছে এবং বেশ কিছু মানুষকে গুম করার অভিযোগও উঠেছে গোষ্ঠীটির যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে।
গত ৩ ডিসেম্বর ইয়েমেনের সরকারি সেনাবাহিনীর সঙ্গে এসটিসির যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়, তাতে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাসহ অন্তত ৩০ জন সেনা নিহত হন। এই সংঘাত ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অবস্থানকে চরম দুর্বল করে দিয়েছে, যার ফলে দেশটির শাসনক্ষমতা এখন কার্যত বহুধা বিভক্ত।
ইয়েমেনের এই অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন দেশটির সরকারপন্থী আল-ইসলাহ পার্টির নেতারা। তারা অভিযোগ করেছেন যে, এসটিসি রিয়াদ চুক্তি লঙ্ঘন করে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতকে তীব্রতর করছে। দলটির পক্ষ থেকে সতর্ক করা হয়েছে যে, সরকার এবং বিচ্ছিন্নতাবাদীদের এই অন্তর্দ্বন্দ্বের সুযোগ নিতে পারে উত্তর ইয়েমেনের শক্তিশালী হুতি বিদ্রোহীরা।
হুতিরা যদি হাদরামাউতের এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে তেলসমৃদ্ধ অঞ্চলে প্রবেশ করে, তবে পুরো ইয়েমেন একটি দীর্ঘমেয়াদি ও ভয়াবহ সংকটের কবলে পড়বে, যা সামাল দেওয়া আঞ্চলিক শক্তির জন্য দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়াবে।
ইয়েমেন সংকটের নেপথ্যে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর বিপরীতমুখী অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। একদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত কৌশলগত কারণে এসটিসিকে সমর্থন ও সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে সৌদি আরব ইয়েমেনের অখণ্ডতা রক্ষায় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
হাদরামাউতের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা রিয়াদের জন্য কেবল নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়, বরং নিজেদের সীমান্তে একটি স্থিতিশীল সরকার নিশ্চিত করার প্রধান চ্যালেঞ্জ। এমন পরিস্থিতিতে এসটিসির এই অনমনীয় অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক অঙ্গনে এক নতুন অস্থিরতার জন্ম দিয়েছে। ইয়েমেনের অখণ্ডতা রক্ষা নাকি বিচ্ছিন্নতাবাদের জয়—কোন দিকে ঘুরবে এই সংঘাতের মোড়, তা এখন সময়ের অপেক্ষা।

