দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে প্রতিবেশী দেশ আফগানিস্তানের প্রতি কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ও প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান ফিল্ড মার্শাল অসীম মুনির। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে আফগানিস্তানকে যেকোনো একটি পক্ষ বেছে নিতে হবে—হয় তারা পাকিস্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক বজায় রাখবে, না হয় ‘ফিতনা আল খারেজি’ তথা উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর পক্ষ নেবে। পাকিস্তান ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠী—উভয় পক্ষের সঙ্গে একসাথে সম্পর্ক রাখা আফগানিস্তানের জন্য আর সম্ভব হবে না বলে তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন।
পাকিস্তানের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘এআরওয়াই নিউজ’ (ARY News)-এর প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, গত রোববার (২১ ডিসেম্বর) ইসলামাবাদে আয়োজিত ‘জাতীয় ওলামা এবং মাশায়েখ সম্মেলনে’ ভাষণ দেওয়ার সময় সেনাপ্রধান মুনির এসব মন্তব্য করেন। তাঁর এই বক্তব্যকে সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানের নিরাপত্তা নীতিতে এক বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকগণ। সেনাপ্রধান দাবি করেন, পাকিস্তানে বর্তমানে যেসব সন্ত্রাসী হামলা সংঘটিত হচ্ছে, তার প্রায় ৭০ শতাংশেরই মূল উৎস হলো আফগান সীমান্ত।
ফিল্ড মার্শাল অসীম মুনির অভিযোগ করেন যে, আফগান তালেবানের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহায়তায় উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো সীমান্ত অতিক্রম করে পাকিস্তানে প্রবেশ করছে। এই সন্ত্রাসীরা নারী ও শিশুসহ পাকিস্তানের নিরীহ বেসামরিক মানুষের ওপর বর্বর হামলা চালিয়ে জানমালের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করছে। তিনি আফগান সরকারের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন যে, সন্ত্রাসবাদ লালন করে প্রতিবেশীর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
সম্মেলনে উপস্থিত ধর্মীয় আলেম ও মাশায়েখদের উদ্দেশে তিনি ইসলামের প্রকৃত শিক্ষার আলোকে ‘জিহাদ’ সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা প্রদান করেন। অসীম মুনির বলেন, “বিশ্বের যেকোনো সার্বভৌম ইসলামিক রাষ্ট্রের বৈধ রাষ্ট্রপ্রধান ছাড়া অন্য কারো এককভাবে জিহাদের ডাক দেওয়ার কোনো ধর্মীয় বা আইনি অধিকার নেই।” ইসলামের নাম ব্যবহার করে যারা সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছে এবং রক্তপাত ঘটাচ্ছে, তাদের কঠোর সমালোচনা করেন তিনি।
পাকিস্তান ও ইসলামের পবিত্র ভূমির মধ্যে একটি আধ্যাত্মিক যোগসূত্র স্থাপনের চেষ্টা করে সেনাপ্রধান বলেন, মহান আল্লাহ পাকিস্তানকে ইসলামের অন্যতম পবিত্র স্থানগুলোর অভিভাবকত্বের সম্মান দান করেছেন। তিনি ইসলামের ইতিহাসে মদিনা রাষ্ট্রের গুরুত্বের সাথে পাকিস্তানের সৃষ্টিতত্ত্বের তুলনা করে বলেন, সৌদি আরবের মদিনা এবং পাকিস্তান—উভয় রাষ্ট্রই কালিমার ওপর ভিত্তি করে পবিত্র রমজান মাসে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই গভীর সামঞ্জস্যই পাকিস্তানের পবিত্রতা ও অখণ্ডতা রক্ষার তাগিদ দেয়।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে তিনি সীমান্ত সুরক্ষা ও প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সামরিক প্রতিযোগিতার প্রসঙ্গও টেনে আনেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, গত মে মাসে ভারতের বিরুদ্ধে পরিচালিত ‘অপারেশন বুনইয়ান-উল-মারসুস’-এর সময় পাকিস্তানি বাহিনী আল্লাহর অলৌকিক সাহায্য প্রত্যক্ষ করেছে। তাঁর মতে, আধ্যাত্মিক শক্তি এবং সুশৃঙ্খল সামরিক বাহিনীই পাকিস্তানের সার্বভৌমত্বের রক্ষাকবচ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সেনাপ্রধানের এই কঠোর অবস্থান আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধির পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন টানাপোড়েনের জন্ম দিতে পারে। পাকিস্তান এখন সীমান্ত নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে আফগানিস্তানের কাছ থেকে সন্ত্রাসবাদ বিরোধী একটি পরিষ্কার প্রতিশ্রুতি আদায় করতে বদ্ধপরিকর।

