প্রকৃতির রুদ্ররোষ অনেক সময় মানুষের সাজানো সংসার তছনছ করে দেয়, কেড়ে নেয় প্রিয়জন কিংবা প্রিয় পোষা প্রাণীকে। তবে দীর্ঘ বিচ্ছেদ শেষে সেই হারানো প্রিয়জনকে ফিরে পাওয়ার গল্পগুলো রূপকথার চেয়েও অলৌকিক মনে হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় এমনই এক হৃদয়স্পর্শী ঘটনার সাক্ষী হলেন হ্যারিকেন হেলেনের তাণ্ডবে সর্বস্বান্ত হওয়া এক পরিবার।
শক্তিশালী এই সামুদ্রিক ঝড়ের সময় নিখোঁজ হওয়া একটি পোষা বিড়াল দীর্ঘ ৪৪৩ দিন পর অলৌকিকভাবে তার মালিকের কোলে ফিরে এসেছে। বিরামহীন অপেক্ষা আর গভীর উদ্বেগের অবসান ঘটিয়ে এই পুনর্মিলনের ঘটনাটি বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
বিখ্যাত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘নিউইয়র্ক পোস্ট’-এর এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, গত বছরের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে আঘাত হানে শতাব্দীর অন্যতম ভয়াবহ হ্যারিকেন ‘হেলেন’। ফ্লোরিডার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া সেই শক্তিশালী ঝড়ের সময় ঘরবাড়ি তছনছ হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি নিখোঁজ হয়ে যায় বিড়ালটি।
পরিবারের সদস্যরা দীর্ঘদিন খোঁজাখুঁজি করেও সে সময় সেটির কোনো সন্ধান পাননি। সময় গড়ানোর সাথে সাথে সবাই বিড়ালটির ফিরে আসার আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন। কিন্তু বিচ্ছেদের ঠিক ৪৪৩ দিনের মাথায় গত ১৩ ডিসেম্বর এক পথচারী নর্থ ক্যারোলিনার একটি রাস্তায় অসহায় অবস্থায় বিড়ালটিকে লক্ষ্য করেন।
বিড়ালটির শারীরিক অবস্থা দেখে সহানুভূতিশীল সেই ব্যক্তি সেটিকে উদ্ধার করে স্থানীয় ‘অ্যাভারি হিউম্যান সোসাইটি’ নামক একটি প্রাণী আশ্রয় কেন্দ্রে (শেল্টার হোম) হস্তান্তর করেন। আশ্রয় কেন্দ্রের কর্মীরা বিড়ালটির স্বাস্থ্য পরীক্ষার সময় এর শরীরে একটি ক্ষুদ্র ‘মাইক্রো চিপ’ খুঁজে পান।
আধুনিক প্রযুক্তির এই চিপটি স্ক্যান করার সাথে সাথেই বেরিয়ে আসে বিড়ালটির আদি পরিচয়। নথিপত্র ঘেঁটে কর্মীরা স্তম্ভিত হয়ে লক্ষ্য করেন যে, এই বিড়ালটি কয়েক শ মাইল দূরে ফ্লোরিডার সেই পরিবারের, যারা এক বছরেরও বেশি সময় আগে হ্যারিকেনের তাণ্ডবে এটিকে হারিয়েছিলেন।
গত রোববার (১৪ ডিসেম্বর) অ্যাভারি হিউম্যান সোসাইটি এক আবেগঘন বিবৃতিতে এই অভাবনীয় সাফল্যের কথা প্রকাশ্যে আনে। সংস্থাটি জানায়, “আমরা যখন বিড়ালটিকে স্ক্যান করলাম, তখন একটি মাইক্রো চিপ আমাদের সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দেয়।
আমরা জানতে পারি, ৪৪৩ দিন আগে হ্যারিকেন হেলেনের ভয়াবহতার মধ্যে এই অবলা প্রাণীটি তার আপনজনদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছিল। আজ দীর্ঘ সময়ের ব্যবধান ঘুচিয়ে সে সেখানে ফিরে গেছে যেখানে তার প্রকৃত স্থান—নিজের পরিবারের পরম মমতায়।” বিড়ালটিকে ফিরে পেয়ে তার মালিকদের আনন্দ ও কান্নার চিত্র ছিল ভাষায় বর্ণনা করারাতীত।
উল্লেখ্য, হ্যারিকেন হেলেন ছিল গত দুই দশকে যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানা সবচেয়ে প্রাণঘাতী ও ধ্বংসাত্মক সামুদ্রিক ঝড়গুলোর মধ্যে একটি। অন্তত ছয়টি অঙ্গরাজ্যে তাণ্ডব চালিয়ে এই ঝড় ২৫০ জনেরও বেশি মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল। নর্থ ক্যারোলিনায় এই প্রাণহানি ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের সেই বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে প্রাণ ও সম্পদ হারিয়ে দিশেহারা হওয়া মানুষের জন্য এই বিড়ালটির ফিরে আসা এক পাক্ষিক সান্ত্বনা ও আশার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। পোষা প্রাণীর শরীরে মাইক্রো চিপ ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা যে কতটুকু, এই ঘটনাটি আবারও তা বিশ্ববাসীর কাছে প্রমাণ করল।

