বিনোদন জগতে নায়িকাদের সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে দীর্ঘকাল ধরে কেবল ‘ছিপছিপে’ শারীরিক গড়নকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। মেধা কিংবা অভিনয়ের চেয়েও অনেক সময় বেশি গুরুত্ব পেয়েছে বাহ্যিক সৌন্দর্য। এর সামান্য বিচ্যুতি ঘটলেই জুটেছে ‘বডি শেমিং’ বা শারীরিক গঠন নিয়ে কড়া সমালোচনা। এমনকি মা হওয়ার পর ওজন বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশ্বসুন্দরী ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চনকেও সহ্য করতে হয়েছিল তীব্র কটাক্ষ। এবার প্রায় একই ধরনের অমানবিক অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলিউডের ভেতরের অন্ধকার দিকটি সামনে আনলেন শক্তিমান অভিনেত্রী রাধিকা আপ্তে।
ভারতীয় গণমাধ্যমে দেওয়া সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে রাধিকা তাঁর ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের একটি হৃদয়বিদারক ঘটনার স্মৃতিচারণ করেন। তিনি জানান, অভিনয় জীবনের শুরুর লগ্নে একটি বড় প্রোডাকশনের চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলেও শুটিং শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে এক অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির শিকার হতে হয় তাঁকে। রাধিকা বলেন, “শুটিং শুরুর আগে আমি ব্যক্তিগত ছুটিতে ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলাম। বিষয়টি আমি আগে থেকেই সংশ্লিষ্টদের জানিয়ে রেখেছিলাম। এমনকি ঘুরতে গিয়ে আমি কঠোর ডায়েট অনুসরণ করব না এবং এর ফলে ওজন কিছুটা বাড়তে পারে—তাও আমি স্পষ্ট করেছিলাম।”
রাধিকার ভাষ্যমতে, তখন তাঁর বয়স কম ছিল এবং শারীরিক বিপাক প্রক্রিয়া (মেটাবলিজম) অত্যন্ত ভালো থাকায় তিনি আত্মবিশ্বাসী ছিলেন যে, ফিরে এসে দ্রুতই ওজন কমিয়ে ফেলতে পারবেন। কিন্তু বিধি বাম। শুটিংয়ের প্রাক্কালে একটি ফটোশুটে অংশ নিতে হয় তাঁকে। সেখানে ছবিতে তাঁর শারীরিক গড়ন কিছুটা ভারী দেখাচ্ছিল। রাধিকা অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে বলেন, “কেবলমাত্র সেই ফটোশুটে আমাকে ‘মোটা’ দেখাচ্ছিল বলে সেই বড় প্রজেক্ট থেকে আমাকে বাদ দেওয়া হয়।”
সেই সময় বড় একটি কাজ হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় মানসিকভাবে প্রচণ্ড বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন এই অভিনেত্রী। শরীরের ওজনের ব্যাপারে তাঁর মনে এক দীর্ঘস্থায়ী ভীতি বা ‘বডি ডিসমোরফিয়া’ তৈরি হয়ে গিয়েছিল। রাধিকা জানান, সামান্য ওজন বাড়লেই তিনি চরম আতঙ্কিত হয়ে পড়তেন যে, হয়তো আবারও তাঁকে কাজ হারাতে হবে। দীর্ঘ সময় এই মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে যাওয়ার পর শেষ পর্যন্ত তিনি পেশাদার মনোবিদের সাহায্য নিতে বাধ্য হন। সেই ভীতি কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে তাঁকে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে।
ব্যক্তিগত জীবনে সম্প্রতি মা হয়েছেন রাধিকা। সন্তান জন্মের পর স্বাভাবিকভাবেই তাঁর শরীরে পরিবর্তন এসেছে এবং ওজন বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে অতীতের সেই ট্রমা কাটিয়ে এখন তিনি জীবনকে নতুন এবং ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে শিখছেন। রাধিকার এই সাহসী স্বীকারোক্তি আবারও প্রমাণ করে দিল যে, পর্দার চাকচিক্যের আড়ালে তারকাদের কতটা অমানবিক মানসিক চাপ এবং শারীরিক সৌন্দর্যের কঠোর মানদণ্ডের মধ্য দিয়ে ক্যারিয়ার টিকিয়ে রাখতে হয়। অভিনেত্রীর এই বক্তব্য গ্ল্যামার দুনিয়ার কথিত ‘সৌন্দর্যের সংজ্ঞা’ নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

