রাজধানীর জিগাতলা এলাকায় একটি বেসরকারি নারী হোস্টেল থেকে ন্যাশনালিস্ট সিভিক পার্টির (এনসিপি) নেত্রী জান্নাতারা রুমীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় হোস্টেলের কক্ষ থেকে তার মরদেহ উদ্ধারের পর রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে শোকের পাশাপাশি গভীর রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে।
এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড নাকি আত্মহত্যা, তা নিয়ে জনমনে নানামুখী প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার নেপথ্যে নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক সংগঠন আওয়ামী লীগের অ্যাক্টিভিস্টদের পক্ষ থেকে ক্রমাগত সাইবার বুলিং ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ উঠেছে।
জান্নাতারা রুমীর মৃত্যুর পর তার রাজনৈতিক সহকর্মী ও দলের শীর্ষ নেতারা চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রদান করেছেন। এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব জানান, গত প্রায় দুই মাস ধরে রুমী অত্যন্ত পরিকল্পিত সাইবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছিলেন।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন ফেসবুক পেজ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট থেকে রুমীকে লক্ষ্য করে অশালীন মন্তব্য, কুরুচিপূর্ণ ছবি এবং তাকে ধর্ষণ ও হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। এমনকি তার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক গোপন তথ্যও অনলাইনে ছড়িয়ে দিয়ে তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করার চেষ্টা করেছিল পতিত আওয়ামী লীগের অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা।
আরিফুল ইসলাম আদীব আরও বলেন, “রুমী গত কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রচণ্ড মানসিক ট্রমা বা মনস্তাত্ত্বিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। দলের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিলেও তাকে অত্যন্ত বিষণ্ন ও বিমর্ষ দেখা যেত। অনবরত আসা এসব হুমকির কারণে তিনি এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও গভীর বিষণ্নতায় ভুগছিলেন।”
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, জান্নাতারা রুমীর মৃত্যুর ঘটনায় তার পরিবারের পক্ষ থেকে হাজারীবাগ থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলার বিবরণীতে রুমীর ব্যক্তিগত জীবনের কিছু সংকটের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, রুমী এর আগে দুবার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে দুটি সংসারই ভেঙে যায়।
তার দুটি সন্তান রয়েছে, যারা বর্তমানে তাদের বাবার কাছে অবস্থান করছে। সন্তানদের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা এবং বৈবাহিক জীবনের টানাপোড়েন তাকে মানসিকভাবে দুর্বল করে দিয়েছিল। পরিবার দাবি করেছে যে, তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিষণ্নতায় ভুগছিলেন এবং এ বিষয়ে নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শও নিচ্ছিলেন।
হাজারীবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শাহাদাত হোসেন জানান, “আমরা হোস্টেলের কক্ষ থেকে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়েছি। পরিবারের পক্ষ থেকে বিষণ্নতার বিষয়টি উল্লেখ করে অপমৃত্যু মামলা করা হলেও আমরা সাইবার বুলিং এবং অন্যান্য সব দিক খতিয়ে দেখছি। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।”
রুমীর মৃত্যুকে ঘিরে সহকর্মীদের মধ্যে সন্দেহের দানা আরও ঘনীভূত হয়েছে। তাদের দাবি, পারিবারিক সমস্যার কথা মামলার এজাহারে থাকলেও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে তাকে আত্মহত্যার পথে ঠেলে দেওয়া হয়েছে কি না, সেটি তদন্তের দাবি রাখে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেভাবে তার ব্যক্তিগত জীবনকে হেয় প্রতিপন্ন করা হচ্ছিল, তা কোনো সুস্থ মানুষের পক্ষে সহ্য করা কঠিন। বিশেষ করে নিষিদ্ধ সংগঠনের কর্মীদের থেকে আসা সরাসরি হুমকির বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনার দাবি জানিয়েছে এনসিপি।
বর্তমানে জান্নাতারা রুমীর মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজধানীর রাজনৈতিক মহলে নতুন করে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যদি সাইবার বুলিং বা প্ররোচনার কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

