বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা করে, প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) কথিত ‘জেআইসি’ সেলে গুম ও ভয়াবহ নির্যাতনের মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ১২ জন সাবেক ও বর্তমান শীর্ষ সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ১৮ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এই গুরুত্বপূর্ণ আদেশ প্রদান করেন। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ গঠন করে এই ঐতিহাসিক রায় দেন। প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই ট্রাইব্যুনাল এলাকায় নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। কড়া পুলিশি পাহারায় এই মামলায় বর্তমানে কারাবন্দি তিন উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তাকে আদালতে হাজির করা হয়। তারা হলেন ডিজিএফআই-এর সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল শেখ মো. সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকী। আদালতের কার্যক্রম শুরু হলে প্রসিকিউশন ও বিবাদী পক্ষের আইনজীবীদের উপস্থিতিতে অভিযোগ গঠনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে নেতৃত্ব দেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, গাজী এমএইচ তামিম ও শাইখ মাহদীসহ অন্যান্যরা।
এই মামলার ১৩ জন আসামির মধ্যে ১০ জনই বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। পলাতক আসামিদের তালিকায় রয়েছেন ডিজিএফআই-এর বিভিন্ন মেয়াদে মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী প্রভাবশালী পাঁচ কর্মকর্তা। তারা হলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আকবর হোসেন, মেজর জেনারেল (অব.) সাইফুল আবেদিন, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. সাইফুল আলম, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আহমেদ তাবরেজ শামস চৌধুরী এবং মেজর জেনারেল (অব.) হামিদুল হক। এছাড়াও শেখ হাসিনার সাবেক প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ তৌহিদুল উল ইসলাম, মেজর জেনারেল কবীর আহাম্মদ এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মখছুরুল হকের বিরুদ্ধেও বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে দাখিলকৃত অভিযোগে জেআইসি সেলে সংঘটিত নির্যাতনের লোমহর্ষক বর্ণনা তুলে ধরা হয়েছে। চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম তাঁর শুনানিতে উল্লেখ করেন, ২০১৫ সালের ২২ অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত বিরোধী মতাদর্শের মানুষদের বেআইনিভাবে তুলে নিয়ে বছরের পর বছর গুম করে রাখা হতো। তথাকথিত ‘আয়নাঘর’ বা গোপন ডিটেনশন সেন্টারে ২৬ জন ভুক্তভোগীর ওপর যে অমানবিক ও বীভৎস নির্যাতন চালানো হয়েছে, তার বিস্তারিত তথ্য ট্রাইব্যুনালে পেশ করা হয়। প্রসিকিউশন পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না, বরং তৎকালীন সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, এর আগে ৯ নভেম্বর গ্রেপ্তারকৃত তিন আসামির পক্ষে আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু অব্যাহতির আবেদন করেছিলেন। তিনি চারটি সুনির্দিষ্ট কারণ বা ‘গ্রাউন্ড’ দেখিয়ে এই মামলা থেকে তাদের মুক্তি চেয়েছিলেন। তবে ট্রাইব্যুনাল সেই আবেদন পর্যালোচনা করে বেআইনি আটক, অপহরণ, নির্যাতন এবং দীর্ঘকাল গুম করে রাখার মতো গুরুতর অভিযোগগুলোকে আমলযোগ্য বলে বিবেচনা করেছেন। পলাতক আসামিদের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন স্টেট ডিফেন্স আইনজীবী হাসান ইমাম এবং আমির হোসেন। উল্লেখ্য যে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে প্রথমে প্রবীণ আইনজীবী জেডআই খান পান্না লড়াই করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেও পরবর্তীতে শারীরিক অসুস্থতার কারণে তা প্রত্যাহার করে নেন। ফলে আদালত মো. আমির হোসেনকে তাঁর আইনজীবী হিসেবে নিয়োগ প্রদান করেন।
ঘটনাপ্রবাহ পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত ৮ অক্টোবর প্রসিকিউশন বিভাগ এই ১৩ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে। এরপর ২২ অক্টোবর গ্রেপ্তারকৃত তিন সেনা কর্মকর্তাকে প্রথমবারের মতো ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয় এবং তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে পলাতক আসামিদের হাজির হওয়ার জন্য জাতীয় দুটি দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালত। দীর্ঘ শুনানি এবং সকল তথ্য-প্রমাণ যাচাই-বাছাই শেষে আজ বিচারিক প্যানেল নিশ্চিত হয়েছেন যে, আসামিদের বিরুদ্ধে বিচার শুরু করার মতো যথেষ্ট প্রাথমিক উপাদান রয়েছে।
এই আদেশ জারির মাধ্যমে বাংলাদেশে গুম ও বিচারবহির্ভূত নির্যাতনের শিকার পরিবারগুলোর দীর্ঘদিনের ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রত্যাশা আরও বেগবান হলো। মানবাধিকার কর্মী ও আইন বিশেষজ্ঞরা এই পদক্ষেপকে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে দেখছেন। ট্রাইব্যুনাল আগামী দিনগুলোতে এই মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ ও অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখবেন। ক্ষমতার অপব্যবহার করে সাধারণ নাগরিকদের মৌলিক অধিকার খর্ব করার যে সংস্কৃতি গত দেড় দশকে গড়ে উঠেছিল, এই বিচারের মাধ্যমে তার একটি সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ বিচারিক সমাপ্তি ঘটবে বলে আশা করছেন ভুক্তভোগীরা।

