আগামী বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এর অংশ হিসেবে নির্বাচনী অপরাধ তদন্ত ও সংক্ষিপ্ত বিচার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য গঠিত ‘নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটি’র সদস্যদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, দায়িত্ব পালনকালে এই কমিটির প্রত্যেক কর্মকর্তার সার্বক্ষণিক সুরক্ষায় দুইজন করে সশস্ত্র পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হবে।
নির্বাচন কমিশনের আইন শাখা থেকে ১৮ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার এই সংক্রান্ত একটি বিশেষ আদেশ জারি করা হয়েছে। দেশের সকল বিভাগীয় কমিশনার, পুলিশ কমিশনার এবং জেলা পুলিশ সুপারদের কাছে ইতোমধ্যে এই নির্দেশনাটি পাঠানো হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নির্বাচনী পরিবেশ স্থিতিশীল রাখা এবং বিচারিক কার্যক্রমে যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত বাধা বা ভীতি প্রদর্শন রোধ করতেই এই কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। মূলত বিচারকদের সমন্বয়ে গঠিত এই অনুসন্ধান কমিটি নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন এবং বিভিন্ন গুরুতর অনিয়মের তদন্তে মাঠ পর্যায়ে কাজ করবে।
ইসির নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে, নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটির (Electoral Enquiry and Adjudication Committee) কর্মকর্তারা যখনই দায়িত্ব পালন করতে বাইরে বের হবেন কিংবা নির্বাচনী এলাকায় অবস্থান করবেন, তখন তাঁদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে জেলা ও মহানগর পুলিশ প্রশাসনকে দুজন করে সশস্ত্র দেহরক্ষী প্রদান করতে হবে। এটি কোনো সাময়িক ব্যবস্থা নয়, বরং পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়া চলাকালীন কর্মকর্তাদের এই সুরক্ষা প্রদান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। উচ্চপদস্থ বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের সুরক্ষায় এটি একটি অগ্রণী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
ব্যক্তিগত নিরাপত্তার পাশাপাশি কোনো এলাকায় অনুসন্ধান বা সংক্ষিপ্ত বিচার কার্য পরিচালনার জন্য যদি অতিরিক্ত শক্তির প্রয়োজন হয়, তবে তার জন্য ‘স্ট্রাইকিং ফোর্স’ ব্যবহারেরও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর অনুচ্ছেদ ৯১কক (২) অনুযায়ী, এই কমিটি যদি কোনো তদন্ত বা বিচার কার্যক্রমের প্রয়োজনে অতিরিক্ত পুলিশ বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা চায়, তবে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কমিশনার, পুলিশ সুপার কিংবা স্থানীয় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তা তাৎক্ষণিকভাবে সরবরাহ করতে বাধ্য থাকবেন। এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে অন্য কোনো বিশেষায়িত আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কমান্ডারদেরও এই কমিটির চাহিদা মোতাবেক সহযোগিতা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, মাঠ পর্যায়ে নির্বাচনী অপরাধের তদন্তে বিচারকদের মনোবল বৃদ্ধি এবং প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করার পরিবেশ তৈরি করতেই এই পদক্ষেপ। সাধারণত নির্বাচনের প্রাক্কালে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করে, যার ফলে অনেক সময় তদন্তকারী কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়। সশস্ত্র পুলিশের উপস্থিতি এবং স্ট্রাইকিং ফোর্সের ব্যাকআপ বিচারকদের সাহসী ও নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক হবে বলে মনে করছে কমিশন।
উল্লেখ্য যে, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠেয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে। নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যে নির্বাচনের রোডম্যাপ চূড়ান্ত করেছে এবং সে অনুযায়ী বিচারিক ও নির্বাহী মেজিস্ট্রেট নিয়োগের প্রক্রিয়াও চলমান। এবারের নির্বাচনে প্রযুক্তির ব্যবহার এবং নিরাপত্তার আধুনিকায়নের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় যাতে ভোটাররা ভয়হীন চিত্তে ভোট দিতে পারেন এবং প্রার্থীরা সমান সুযোগ পান, তা নিশ্চিত করাই কমিশনের প্রধান লক্ষ্য।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নির্বাচন কমিশনের এই নির্দেশনা বাস্তবায়নে তারা পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছেন। সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে ইতোমধ্যে জনবল বিন্যাসের কাজ শুরু হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে প্রতিটি জেলাকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে যাতে নির্বাচনী অনুসন্ধান কমিটির কোনো সদস্যের নিরাপত্তায় সামান্যতম ত্রুটি না থাকে। সরকারের এই কঠোর অবস্থানের মধ্য দিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা পেশিশক্তির ব্যবহারের সুযোগ রাখা হবে না বলেই ইঙ্গিত মিলছে।

