জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখসারির অকুতোভয় যোদ্ধা এবং ইনকিলাব মঞ্চের অন্যতম মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির শারীরিক অবস্থা বর্তমানে অত্যন্ত উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়া হলেও তার স্বাস্থ্যের আশানুরূপ উন্নতি হয়নি, বরং দিন দিন পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে।
সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এই ছাত্রনেতার সর্বশেষ শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে সরাসরি খোঁজ নিতে বুধবার হাসপাতাল পরিদর্শন করেছেন সিঙ্গাপুরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. ভিভিয়ান বালাকৃষ্ণান। তিনি হাদির শয্যাপাশে বেশ কিছুক্ষণ অবস্থান করেন এবং কর্তব্যরত চিকিৎসকদের সাথে তার বর্তমান শারীরিক জটিলতা ও চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। পরিদর্শন শেষে তিনি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের সাথে টেলিফোনে কথা বলে হাদির আশঙ্কাজনক অবস্থার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করেছেন।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক জরুরি বার্তায় জানানো হয়েছে যে, বুধবার রাত ৯টা ৪০ মিনিটে সিঙ্গাপুরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. ভিভিয়ান বালাকৃষ্ণান প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসকে ফোন করেন। আলাপকালে তিনি অত্যন্ত ভারাক্রান্ত মনে জানান যে, শরিফ ওসমান হাদির অবস্থা এখন অত্যন্ত সংকটাপন্ন এবং তার জীবন রক্ষায় চিকিৎসকরা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে তিনি আরও জানান যে, হাদির সর্বশেষ সিটিস্ক্যান রিপোর্টে তার মস্তিষ্কে ‘ইসকেমিয়া’ বা রক্তাল্পতাজনিত সমস্যার মাত্রা অনেক বেড়ে গেছে। এই জটিলতার কারণে তার স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও বাড়িয়ে তুলেছে। উন্নত প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে সেবা প্রদান করা হলেও হাদির শরীর বর্তমানে ওষুধের প্রতি সেভাবে সাড়া দিচ্ছে না, যা চিকিৎসকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
শরিফ ওসমান হাদি জুলাই মাসের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে রাজপথে অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। আন্দোলন চলাকালীন সময়ে তিনি এক ভয়াবহ হামলার শিকার হন। প্রত্যক্ষদর্শী ও তদন্ত সূত্রে জানা গেছে যে, একটি হোন্ডা হর্নেট মোটরসাইকেলে চড়ে আসা আততায়ীরা তাকে লক্ষ্য করে খুব কাছ থেকে গুলি ছুঁড়েছিল।
এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ইতোমধ্যে একজনকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে এবং ব্যবহৃত যানবাহনটি জব্দ করা হয়েছে। সেই হামলায় গুরুতর আহত হওয়ার পর থেকেই হাদি জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছেন। দেশে প্রাথমিক চিকিৎসার পর তার অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় সরকারি উদ্যোগে তাকে সিঙ্গাপুরের বিশ্বমানের হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল। দেশের সাধারণ মানুষ এবং ছাত্রসমাজ অধীর আগ্রহে তার সুস্থতার সংবাদ শোনার জন্য অপেক্ষা করছিলেন, কিন্তু সিঙ্গাপুর থেকে আসা সর্বশেষ এই বার্তা দেশজুড়ে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
ড. ভিভিয়ান বালাকৃষ্ণানের ফোন পাওয়ার পর প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি হাদির পরিবারের প্রতি সহানুভূতি জ্ঞাপন করেন এবং বিদেশের মাটিতে দেশের এই সাহসী সন্তানের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টার আশ্বাস দেন। প্রধান উপদেষ্টা এক বিশেষ বার্তায় দেশবাসীকে ধৈর্য ধারণ করার এবং শান্ত থাকার জন্য বিনীতভাবে আহ্বান জানিয়েছেন।
একই সাথে তিনি শরিফ ওসমান হাদির দ্রুত রোগমুক্তি ও সুস্থতার জন্য মহান আল্লাহর কাছে দোয়া ও প্রার্থনা করার অনুরোধ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, হাদির মতো তরুণরা দেশের সম্পদ এবং তাদের আত্মত্যাগ জাতি চিরকাল কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হাদির চিকিৎসার যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করছে এবং সিঙ্গাপুরের চিকিৎসকদের সাথে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে।
সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) থাকা হাদির বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে, মস্তিষ্কের ইসকেমিয়া বৃদ্ধি পাওয়া মানে হলো রক্ত চলাচলে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটা, যা যেকোনো সময় বড় ধরনের বিপত্তি ঘটাতে পারে। তার স্নায়বিক অবস্থা স্থিতিশীল করার জন্য সেখানে একটি বিশেষ মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে।
তবে দীর্ঘ সময় ধরে অচেতন থাকায় এবং শরীরের অভ্যন্তরীণ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো দুর্বল হয়ে পড়ায় চিকিৎসা প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদেশের মাটিতে শরিফ ওসমান হাদির এই জীবনযুদ্ধ এখন কেবল তার ব্যক্তিগত লড়াই নয়, বরং তা জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশ-বিদেশের অগণিত মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার জন্য শুভকামনা জানাচ্ছেন এবং এই ক্রান্তিকালে হাদির পরিবারের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
শরিফ ওসমান হাদির বর্তমান শারীরিক পরিস্থিতি নিয়ে সরকারি পর্যায় থেকে নিয়মিত আপডেট দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে যেন কোনো ধরনের গুজব বা বিভ্রান্তি না ছড়ায়, সেদিকেও সতর্ক দৃষ্টি রাখার আহ্বান জানিয়েছে সরকার। আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে হাদির নির্ভীক কণ্ঠস্বর এবং নেতৃত্বের গুণাবলী তরুণ প্রজন্মের কাছে তাকে একজন আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।
তার সুস্থতা এখন জাতীয় কামনায় পরিণত হয়েছে। সিঙ্গাপুরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বিশেষ নজর এবং সরাসরি প্রধান উপদেষ্টাকে ফোনের মাধ্যমে বিষয়টি অবহিত করা প্রমাণ করে যে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের এই সাহসী তরুণের ঘটনাটি গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। আপাতত পুরো জাতি হাদির জন্য প্রার্থনায় রত এবং একটি মিরাকল বা অলৌকিক সুস্থতার অপেক্ষায় রয়েছে, যাতে দেশের এই মেধাবী মুখটি আবারো রাজপথে ফিরে আসতে পারে।

