আসন্ন ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন কেবল ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রথাগত প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনর্গঠনের এক ঐতিহাসিক ও নির্ণায়ক মুহূর্ত বলে মন্তব্য করেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ তিন মন্ত্রণালয়ের (তথ্য ও সম্প্রচার, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানি সম্পদ) উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তিনি বিশ্বাস করেন, এই নির্বাচনের মাধ্যমেই এমন একটি সুদৃঢ় ভিত্তি তৈরি হবে, যা রাষ্ট্রব্যবস্থাকে সরাসরি জনগণের কাছে জবাবদিহির আওতায় আনবে।
মঙ্গলবার (১৬ ডিসেম্বর) মহান বিজয় দিবস উপলক্ষ্যে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান নির্বাচনের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে এ দেশের মানুষ যে বৈষম্যহীন ও শোষণমুক্ত সমাজের স্বপ্ন দেখে আসছে, আগামী ফেব্রুয়ারির নির্বাচন হতে পারে সেই লক্ষ্য অর্জনের মূল সূচনাবিন্দু। এটি কেবল একটি সাধারণ নির্বাচন নয়, বরং এক অর্থে এটি একটি গণভোটও বটে। রাষ্ট্রীয় সংস্কারের যে মৌলিক প্রশ্নগুলো সামনে এসেছে, সেখানে নাগরিকরা সরাসরি তাদের মতামত প্রদানের সুযোগ পাবেন। জনগণের সেই রায়ের ভিত্তিতেই বাংলাদেশের গণতন্ত্রের নতুন যাত্রা শুরু হবে।”
দেশের প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির নেতিবাচক দিকগুলো নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন এই উপদেষ্টা। তিনি স্পষ্টভাবে জানান যে, নতুন বাংলাদেশে সহিংস রাজনীতির কোনো স্থান নেই। প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করার পরিবর্তে হামলা বা হত্যার পথ বেছে নেওয়াকে তিনি ‘কাপুরুষোচিত’ বলে আখ্যায়িত করেন।
রিজওয়ানা হাসান বলেন, “যুক্তি ও তর্কের বদলে সহিংসতা বেছে নেওয়ার মধ্যে কোনো বীরত্ব নেই। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে শক্তি প্রদর্শনের একমাত্র বৈধ পথ হলো জনগণের ম্যান্ডেট অর্জন করা। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার যে পুরনো সংস্কৃতি আমরা দেখে আসছি, আধুনিক বাংলাদেশে তা পুরোপুরি বর্জনীয়। সরকার তখনই প্রকৃত অর্থে সফল হবে, যখন আমরা সুষ্ঠু নির্বাচন, ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোগত সংস্কারের লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়ন করতে পারব।”
নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে সরকারের দৃঢ় অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মূল লক্ষ্য হলো একটি শান্তিপূর্ণ, স্বচ্ছ ও স্বতঃস্ফূর্ত নির্বাচন নিশ্চিত করা, যেখানে প্রতিটি মানুষ নির্ভয়ে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে। তবে এই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে একটি বিশেষ মহলের সক্রিয় তৎপরতা নিয়ে তিনি দেশবাসীকে সতর্ক করেন।
উপদেষ্টা বলেন, “নির্বাচনী প্রক্রিয়া ব্যাহত করার এবং জনগণকে আতঙ্কিত করার একটি পরিকল্পিত প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার পাশাপাশি ব্যাপক সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলাও অত্যন্ত জরুরি। সরকার জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতে তার সর্বশক্তি নিয়োগ করছে এবং আমরা একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথেই অগ্রসর হচ্ছি।”
বিজয় দিবসের এই মাহেন্দ্রক্ষণে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের এই বক্তব্য রাষ্ট্র সংস্কার এবং গণতান্ত্রিক উত্তরণের ক্ষেত্রে সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকারেরই প্রতিফলন। তিনি মনে করেন, বীর শহীদদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে হলে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা পরিহার করে সুস্থ ধারার গণতান্ত্রিক চর্চায় ফিরে আসাই এখন সময়ের দাবি।

