মহান বিজয় দিবসের সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ঐতিহাসিক ভাষণে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস জানিয়েছেন, দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর। তিনি উল্লেখ করেন, বেগম জিয়ার পরিবারের ইচ্ছাকে সর্বোচ্চ সম্মান জানিয়ে প্রয়োজনীয় সব ধরনের রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা প্রদান করা হচ্ছে।
বিজয় দিবসের ভাষণে বেগম খালেদা জিয়ার বর্তমান শারীরিক অবস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “জাতীয় নেত্রী, দেশের তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং গণতান্ত্রিক সংগ্রামের অন্যতম শীর্ষ ব্যক্তিত্ব বেগম খালেদা জিয়া বর্তমানে অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এটি আমাদের সবার জন্যই অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়।” তিনি আরও যোগ করেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে বেগম খালেদা জিয়ার ত্যাগ ও অবদান অনস্বীকার্য। তাঁর প্রতি জনগণের যে গভীর শ্রদ্ধা ও আবেগ রয়েছে, সেটিকে সম্মান জানিয়ে সরকার ইতিমধ্যে তাঁকে ‘রাষ্ট্রের অতিগুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ (VIP) হিসেবে ঘোষণা করেছে।
ড. ইউনূস স্পষ্ট করেন যে, বেগম জিয়ার উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সরকার সব সময় পরিবারের সাথে যোগাযোগ রাখছে। তিনি বলেন, “সরকারের পক্ষ থেকে তাঁর সুচিকিৎসা নিশ্চিতে পরিবারের চাওয়াকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দেশে চিকিৎসার পাশাপাশি প্রয়োজন হলে তাঁকে বিদেশে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানোর সব ধরণের প্রস্তুতি ও সম্ভাবনা সরকারের বিবেচনায় রয়েছে।”
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ নির্বাচন নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা দেশবাসীকে এক শক্তিশালী বার্তা দেন। তিনি বলেন, “ভোট মানে কেবল কাগজে সিল মারা নয়; এটি রাষ্ট্র বিনির্মাণে আপনার সক্রিয় অংশগ্রহণ। নির্বাচনের মাঠে রাজনৈতিক দলগুলো একে অপরের প্রতিযোগী হবে, শত্রু নয়।” তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যারা ভোট ডাকাতি করবে তারা নাগরিকের দুশমন। ভোট রক্ষা করা মানেই দেশ রক্ষা করা। যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দিয়ে জাতির ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে মাঠ প্রশাসন এবং পুলিশ বাহিনীতে প্রয়োজনীয় রদবদল আনা হয়েছে বলে জানান প্রধান উপদেষ্টা। তিনি পরিষ্কার করেন যে, এই পরিবর্তনগুলো কোনো অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী হয়ে নয়, বরং পেশাদারিত্ব ও দক্ষতা নিশ্চিত করতেই করা হয়েছে। এছাড়া এবারের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো প্রবাসীরা পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে যাচ্ছেন, যা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি নতুন মাইলফলক।
প্রধান উপদেষ্টা তাঁর ভাষণে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নে জনগণের মতামত নিতে গণভোটের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “নির্বাচনের দিনই আপনারা গণভোটের মাধ্যমে জানাবেন যে জুলাই সনদের সংস্কার কাঠামো আপনারা চান কি না।” এছাড়া বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পৃথক সচিবালয় গঠনের ঘোষণা দিয়ে তিনি একে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে এক ‘যুগান্তকারী মাইলফলক’ হিসেবে অভিহিত করেন। এর ফলে বিচার বিভাগ এখন থেকে যেকোনো রাজনৈতিক চাপ বা প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করতে পারবে।
অধ্যাপক ইউনূস তাঁর ভাষণের শেষে একটি বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত এবং সুশাসিত বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বিশ্বাস করেন, জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমেই চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে নতুন বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা সফল হবে।

