মহান বিজয় দিবসের ৫৪তম বার্ষিকীতে জাতির উদ্দেশে এক দূরদর্শী ও দিকনির্দেশনামূলক ভাষণ দিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। মঙ্গলবার (১৬ ডিসেম্বর) রাতে দেওয়া এই ভাষণে তিনি দেশের তরুণ প্রজন্মের অসীম সাহসের প্রশংসা করার পাশাপাশি আগামী সাধারণ নির্বাচন ও রাষ্ট্র সংস্কারের এক চূড়ান্ত রোডম্যাপ ঘোষণা করেন। প্রধান উপদেষ্টা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং একই দিনে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বা সাংবিধানিক সংস্কারের ওপর গণভোট গ্রহণ করা হবে।
ভাষণের শুরুতেই ড. ইউনূস দেশের কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের নির্ভীক চিত্তের প্রতি গভীর আস্থা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “আমাদের তরুণদের মনে কোনো ভয়ডর নেই। নির্বাচনের আর মাত্র দুই মাস বাকি। আমি বিশ্বাস করি, এই তরুণ সমাজই নির্বাচনের প্রতিটি মুহূর্তকে উৎসবমুখর করে রাখবে।” তিনি দেশবাসীকে আহ্বান জানান যেন কোনো ধরনের হিংসা বা কোন্দল নির্বাচনী পরিবেশকে কলুষিত করতে না পারে। প্রধান উপদেষ্টার মতে, তরুণরাই হবে দেশের সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অতন্দ্র প্রহরী।
বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সমালোচনা করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, যারা দেশ ছেড়ে পালিয়েছে, তারা তরুণ যোদ্ধাদের তাদের পুনরুত্থানের পথে প্রধান বাধা হিসেবে দেখছে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “পতিত শক্তি চায় নির্বাচনের আগেই তরুণদের এই বাধা সরিয়ে দিয়ে পুনরায় নিজেদের রাজত্ব কায়েম করতে। তাদের নানা চোরাগোপ্তা হামলা ও কঠিনতর ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনা রয়েছে। আমাদের সবাইকে সমস্বরে বলতে হবে—আমরা আমাদের তরুণদের রক্ষা করব।” তিনি পুরনো আমলের রাজনৈতিক দাসত্ব থেকে বেরিয়ে এসে দেশের ওপর জনগণের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অগ্রাধিকারের কথা উল্লেখ করে ড. ইউনূস জানান, জুলাই-আগস্ট হত্যাকাণ্ডের বিচারকাজ অত্যন্ত স্বচ্ছতার সাথে এগিয়ে চলছে। তিনি উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচার হত্যাকাণ্ডের প্রধান নির্দেশদাতা হিসেবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে শেখ হাসিনা এবং সাজাপ্রাপ্ত সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য ইতিমধ্যে ভারত সরকারকে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানানো হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় সংস্কারের বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টা একটি যুগান্তকারী ঘোষণা দেন। তিনি জানান, মৌলিক সাংবিধানিক সংস্কার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ আদেশ আকারে জারি করা হয়েছে। তবে এই সংস্কারের চূড়ান্ত অনুমোদনের ভার তিনি দেশের নাগরিকদের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি এই সনদের ওপর একটি জাতীয় গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। ভোটাররা ‘হ্যাঁ/না’ ভোটের মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক সংস্কারের পক্ষে বা বিপক্ষে তাদের রায় দেবেন। ড. ইউনূস বলেন, “এই গণভোটের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে নতুন বাংলাদেশের চরিত্র, কাঠামো ও অগ্রযাত্রার গতিপথ।”
নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে এবং সরকার কমিশনকে সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করছে। প্রধান উপদেষ্টা তাঁর ভাষণের শেষে বিজয় দিবসের চেতনাকে ধারণ করে একটি বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি মনে করেন, এবারের নির্বাচন ও গণভোট বাংলাদেশের ইতিহাসে এক সন্ধিক্ষণ, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি স্থিতিশীল ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে।

